২৯৭. ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারের কৃতিত্ব

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ তানুজা বড়ুয়া

<৬, ২৯৭, ৫১১-৫১৩>

শিরোনামঃ বাংলাদেশ সরকারের কৃতিত্ব

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ ভলিউম ১ নং ২১

তারিখঃ ১৭ নভেম্বর, ১৯৭১

.

বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য

আজকের বাংলাদেশ সরকার একটি অসামান্য আন্দোলন এবং লাখো পীড়িত মানুষের রক্তে রাঙ্গানো প্রেক্ষাপট থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর উদয় ঘটেছে প্রথাগত উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে, যা একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যাশিত। পাকিস্তানের গত নির্বাচনের বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ, যারা পূর্ব বাংলায় ৮৮,৬ শতাংশ আসন পায় এবং জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ২১ টি আসন লাভ করে, ছিল সংবিধানসম্মত একটি রাজনৈতিক দল যারা আইনি প্রক্রিয়ায় সামাজিক সংস্কারে বিশ্বাসী ছিল। এ ধরনের পটভূমির একটি দল এবং তার নেতৃত্বের জন্য একটি সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করাটা ছিল একটি অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত অগ্রগতি।

 

এক অনন্য নেতৃত্ব

কিন্তু আজ সেই একই দল, ইতিহাসের এক অনন্য প্রেক্ষাপটে, একটিঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধেসশস্ত্র সংগ্রামে দৃঢ়তার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনী আক্রমণ শুরু করার ১৫ দিনেরও কম সময়ে , দেশের নির্বাচিত নেতারা একত্র হন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে একটি সরকার গঠন করেন। প্রথাগত ধ্যানধারণা থেকে এই সরকার গঠন করা হয়নি, বরং এই সরকারের প্রধান কাজ ছিল দখলদার বাহিনীকে এই ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করার জন্য মুক্তিফৌজকে নেতৃত্ব দেওয়া।একইসাথেসরকারের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল এবং দখলদার অধিকৃত অঞ্চলেরমানুষকে সর্বোচ্চআইনী অধিকার প্রদান করা। এই সরকারকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার তদারকি করতে হচ্ছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়ানো লক্ষ লক্ষ মানুষের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।  তাকে এই বিশাল যুদ্ধের অর্থায়ন করতে হচ্ছে এবং একই সাথে বিশ্ব জুড়ে সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখা এবং প্রচারণা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হচ্ছে।

 

মুক্তিবাহিনী : বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত গেরিলা বাহিনী

বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী , স্বেচ্ছাসেবক , ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিবাহিনী আজ  একটি সুসংগঠিত এবং সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এটি যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং কলবরেও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি বিরাট কৃতিত্ব যে তারা সফলভাবে সমগ্র মুক্তিবাহিনীকে একটি একক সুশৃঙ্খল নেতৃত্বের অধীনে সামিল করতে পেরেছে এবং এখন যুদ্ধ চলছে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে থেকে।

বিশ্বের আর কোন অংশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শত্রুকে দুর্বল করা এবং একক প্রচেষ্টায় যুদ্ধপ্রক্রিয়া সংগঠিত করার ক্ষেত্রে এত দ্রুত সাফল্যের মুখ দেখেনি। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য কোন স্বাধীনতা সংগ্রামেইএত অসাধারণ সুশিক্ষিত গেরিলা বাহিনী অংশগ্রহণ করেনি। মুক্তিবাহিনী এখন সব ক্ষেত্রে সুসজ্জিত । মুক্তিবাহিনী সম্প্রতি তরুণ অফিসারদের প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং সম্পন্ন করেছে এবং ট্রেনিং এর আওতাধীন আছে আরো অনেকে। মুক্তি বাহিনীর নৌ – কমান্ডোগণ  ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নৌ চলাচলকে অকার্যকর করতে সফল হয়েছেন। ঢাকা সহ অন্যান্য বড় এলাকায় গেরিলা বাহিনী তাদের কার্যকর এবং স্থায়ী অবস্থান সুনিশ্চিত করেছেন।

 

কূটনীতি এবং যুদ্ধ প্রচারণা

কূটনৈতিকফ্রন্টে, বাংলাদেশসরকারের ঈর্ষনীয় সাফল্য ছিলো। বিশ্বে সম্ভবত এটিই একমাত্র আন্দোলন যেখানে এত ব্যাপক সংখ্যক কূটনীতিবিদ একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী আরেকটি সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন।রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে জুনিয়র ৩০ জন কূটনৈতিক নতুন সরকারে যোগদান করেছেন এবং আরো ৯৬ জন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাওতাদের আনুগত্য বদল করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর অসাধারণ সাফল্য এবং দেশের ভেতর এবং বাইরের ৭৫ মিলিয়ন মানুষের বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ, বিশ্বস্ততা এবং আনুগত্যের জন্যই এটি সম্ভবহয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রচারযন্ত্রও বিশ্বজনমতকে তার পক্ষে প্রভাবিত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এখন পর্যন্ত এটি ২৫০ জোন বিদেশি সাংবাদিক, বেতার , টেলিভিশন এর কর্মী এবং আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছে। বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, সাংবাদিকদের এবং ১০০ এর ও বেশি বিদেশি অতিথি এবং প্রতিনিধিদের দেখাশোনায়কোলকাতা সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। বহির্বিশ্বে বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিষয়ক তথ্য সরবরাহের জন্য ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেবহির্বিশ্ববিষয়কপ্রচারণাবিভাগ। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি উপস্থাপনের জন্য ভারতের সকল এলাকাসহ মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়াতেও প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে। জনসাধারণের মনোবল তুঙ্গে রাখতে সংবাদ মাধ্যম ও তথ্য বিভাগএবং তাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গ বাংলাদেশ বেতার অসাধারণ  কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। পরিশেষে, ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে জাতিসংঘের লবিং এ পাঠানো হয়েছে এবং তারা  নবগঠিত রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য সুদৃঢ় আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সফল হয়েছে।

 

প্রশাসন

বাংলাদেশ সরকারের কঠোর প্রচেষ্টা বেসামরিক প্রশাসনের কার্যকর সংহতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে যা মুক্তিবাহিনীর সামগ্রিক প্রচেষ্টাকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রয়োজনীয় সব বিভাগসহ তরুণ এবং দক্ষ কর্মকর্তা, কুশলী এবং বিভিন্ন পেশা থেকে আগত স্বেচ্ছাসেবকদের  নিয়ে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।  উক্ত প্রশাসন মুক্ত অঞ্চল সমূহের ব্যবসা – বাণিজ্য , আদালত, শিল্প –কারখানা, ডাক এবং টেলিযোগাযোগ ব্যাবস্থা, থানা , বিদ্যালয় , বহিঃ শুল্ক , অন্তঃ শুল্ক ব্যবস্থা এবং কর সংগ্রহসহ অন্যান্য কাজে নিয়োজিত আছে।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চলমান যুদ্ধ প্রক্রিয়া এবং মুক্তাঞ্চলের প্রশাসনিক কাজকর্ম তদারকি ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার একই সাথে ভবিষ্যতের বিষয়েও যথেষ্ট সচেতন। ইতোমধ্যে দেশের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিতএকটি পরিকল্পনা কমিশন নতুন সমাজের জন্য আর্থ- সামাজিক অবকাঠামো প্রস্তুত করছেন। সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন যে যুদ্ধ-পরবর্তী দায়িত্ব অনেক ব্যাপক ও কঠিন হবে এবং অবিলম্বে ব্যাপকভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শুরু করতে হবে। বাংলাদেশকে তার জনগণের প্রয়োজন এবং চাহিদা পূরণে সচেষ্ট হতে হবে, যারা এরই মধ্যে এই বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে।

 

জনযুদ্ধ

এই সংগ্রামকে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত করতে বাংলাদেশ সরকার দেশের অন্যান্য বাহিনীকেও নিয়োজিত করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই গণযুদ্ধকে শক্তিশালী করতে ৫- সদস্য বিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে যে যুদ্ধ এখন সরাসরি বিজয়ের নিশ্চিত রূপ নিয়েছে।

 

শেখ মুজিবুর রহমান

আমাদের নেতা এবং এই স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুপ্রেরণার উৎস, যিনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে “বাংলাদেশ” শব্দটি উচ্চারণ করেছেন, তিনি এখনো দখলদার বাহিনীর হাতে বন্দি। তা সত্ত্বেও , এটি লক্ষণীয় বিষয়যে, শেখ মুজিবুর রহমান এখনো বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছেন। তিনি সাহস, ত্যাগ এবং মানুষের প্রতি আত্মদানের একজীবন্তপ্রতিমূর্তিহিসাবেবিরাজকরছেন। বাংলাদেশের জনগণ আত্মবিশ্বাসী যে তারা শীঘ্রই তাদের নেতাকে ফিরে পাবে।

একটি স্বাধীন বাংলাদেশ এখন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত ত্বরিত সাফল্য ইতিহাসের আর কোন স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথেই সমতুল্য নয়। সুনিশ্চিত বিজয় জেনে সে একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য , শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মসূচী  হাতে নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার এসব কর্মসূচী সফলভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ যেমনভাবে সে জনগণকে মুক্ত করার আন্দোলনেও শরীক হয়েছিল।