২. ২৬ এপ্রিল যুক্তরাজ্য ডায়েরী

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ তানভীর হেদায়েত

<৬, ২, ৫৬৩-৫৬৮>

শিরোনামঃ যুক্তরাজ্য ডায়েরী

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ নিউজ লেটার লন্ডনঃ নং  ৪

তারিখঃ ২৬ শে এপ্রিল, ১৯৭১

.

যুক্তরাজ্যের দিনলিপি

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যকর পরিষদ

 

       ২৪শে এপ্রিল, ১৯৭১ শনিবার; যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রিতে স্থানীয় ও আঞ্চলিক কার্যকর পরিষদের প্রতিনিধিদের জাতীয় সম্মেলনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যকর পরিষদ গঠন করা হয়। ১২৫ জনেরও বেশী সর্বজনস্বীকৃত প্রতিনিধি এবং ২৫ জনেরও বেশী পর্যবেক্ষক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেগম বিলকিস বানুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহ উপাচার্য বিচারপতি আবু সাইয়ীদ চৌধুরী।

       কেন্দ্রীয় কার্যকর পরিষদের সৃষ্টি যুক্তরাজ্যের বাংলাভাষী অভিবাসীদের রাজনৈতিকভাবে একত্রীকরণের এক নবযাত্রার সূচনা করেছে। সংগঠকরা উল্লেখ করেন, এই কাজটি অনেক শ্রমসাধ্য হবে। কিন্তু তারা আশাবাদী ভবিষ্যতে অবশ্যই এই কাজের সুফল পাওয়া যাবে। জনাব আবু সাইয়ীদ চৌধুরী তার সমাপনী বক্তব্যে এই সম্মেলনকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের আন্দোলনের জন্য ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।

       সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কার্যকর পরিষদের সকল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫ সদস্যের কার্যকর সমিতি নির্বাচিত করা হয়। জনাব আবু সাইয়ীদ চৌধুরীকে নবগঠিত সমিতির উপদেষ্টা পদের জন্য আহবান জানানো হয়।

 

অ্যাকশন বাংলাদেশ ক্লিয়ারিং হাউজ

       পিস নিউজ এর কার্যালয়ে ২টি সভার পর বাংলাদেশ এবং এর সাহায্যার্থে সকল কার্যক্রমের জন্য ক্লিয়ারিং হাউজ গঠন করা হয়। এই সভায় বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা ; যেমন – বাংলাদেশ ছাত্র কার্যক্রম সমিতি, ইন্টারন্যাশনাল কন্সাইন্স ফর অ্যাকশন, পিস প্লেডজ ইউনিয়ন, ফ্রেন্ডজ পিস কাউন্সিল, থার্ড ওয়ার্ল্ড রিভিউ, ইয়ং লিবারেলস, পিস নিউজ, ক্যাম্পেইন ফর সেলফ রুল ফর বাংলাদেশ উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য জনাব মাইকেল বার্নস এবং জাকারিয়া চৌধুরী।

       এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্বের এই সংকটলগ্নে বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তায় লন্ডনে ক্লিয়ারিং হাউজ গঠন করা হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ জনগণের কাছে পৌছানো নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। একটি কার্যালয়, ফোন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়েই এই ক্লিয়ারিং হাউজ গঠিত। ক্লিয়ারিং হাউজের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারী, সংবাদ সংস্থা, শান্তি ও ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা কিভাবে তাদের জনবল অগ্রসর করাবে এবং ত্রাণ বিতরণ করবে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা হবে। ঠিকানা – অ্যাকশন বাংলাদেশ ক্লিয়ারিং হাউজ। ৩৪ স্ট্রাটফোরড ভিলাস। লন্ডন এন ডাব্লিও ১। টেলিফোন – ০১-৪৮৫২৮৮৯। শুধুমাত্র সকাল ১০ টা থেকে বেলা ১ টা পর্যন্ত। সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত কার্যালয় খোলা থাকবে।

 

ত্রাণ তহবিল

 

       জেনেভার রেড ক্রস সোসাইটির সংঘ ফেডারেশন অফ ন্যাশনাল রেড ক্রস দল তাদের দীর্ঘমেয়াদী শরৎকালীন ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত নাগরিক পুনর্বাসন প্রকল্প অনিদৃস্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। সংঘের কাছে প্রায় ২ মিলিয়ন বৃটিশ পাউন্ড অব্যবহৃত পড়ে আছে। বৃটেনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, যার অন্তর্ভুক্ত বৃটিশ রেড ক্রস, অক্সফাম, সেভ দ্যা চিল্ড্রেন, ওয়ার অন ওয়ান্ট এবং ক্রিশ্চিয়ান এইড নিদৃষ্ট প্রকল্পে প্রায় ৮ লক্ষ বৃটিশ পাউন্ড খরচ করেছে এবং এসব সংস্থার কাছে আরও প্রায় ৭ লক্ষ পাউন্ড রয়েছে যা যুদ্ধ, তথ্য ও যোগাযোগ ঘাটতির কারণে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

       ১৫ই এপ্রিল গার্ডিয়ান পত্রিকার মাইকেল লেক এক উদ্ধৃতিতে জানান, – খুব সহজেই এই অবস্থার সংকলন করা সম্ভব। নির্মম সত্য হচ্ছে, পূর্ব বঙ্গের অর্থনীতি যা সর্বদাই সমস্যাগ্রস্ত ছিল, এখন পুরনাঙ্গরূপে ভেঙ্গে পড়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বিতরণ অবকাঠামো স্থানীয় পরিষদ থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্রই ধ্বংসের শেষ পর্যায়। চট্টগ্রামের মুল বন্দর অথর্ব হয়ে আছে এবং ২৬ টি ত্রাণ বাহী জাহাজ বন্দরের বাহিরে অবস্থান করছে। প্রাক বর্ষাকালীন বৃষ্টি সম্ভাব্য সকল অগ্রসরতায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। আগামী মাসের সম্ভাব্য বর্ষা আবশ্যিকভাবেই বন্দরের পড়ে থাকা সকল ত্রাণ সামগ্রীর নষ্ট হওয়া নিশ্চিত করছে। উপরন্ত অর্ধ বাৎসরিক ঘূর্ণিঝড় অধিক সংখ্যক মৃত্যু ও ক্ষতির পূর্বাভাস দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের সরকার পূর্ব বাংলার প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কিন্তু, বস্তুত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে একত্রীভূত হওয়া সমগ্র জনসংখ্যার সামনে তাদের অভিযান ব্যর্থ হয়েছে।

 

“আমরা এত নিশ্চুপ কেন?”

 

       “আমরা এত নিশ্চুপ কেন?” – এভাবেই জনাব উডরো ওয়াট ২৬শে এপ্রিলের ডেইলি মিররের প্রথম পাতার এক অনুচ্ছেদে তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ” আমি পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া গণহত্যার প্রতিবাদে একটি শব্দও না বলা ও না লেখার জন্য গভীরভাবে লজ্জিত।

এবং কেন আমরা এত নীরব?

কোথায় সেসব বিপ্লবী যারা বায়াফ্রাতে বৃটিশ ও নাইজেরিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল?

কোথায় সেসব মানব দরদী যারা পারমাণবিক অস্ত্র সমর্পণের দাবীতে অল্ডারমাস্টন থেকে পদযাত্রা করেছিল?

পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা এসব ঘটনার থেকেও ভয়াবহ।

বায়াফ্রার অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর, কিন্তু বায়াফ্রার কর্নেল অযুকয়া কোনরকম প্ররোচনা ছাড়াই অপ্রয়োজনীয় এই গৃহযুদ্ধ শুরু করেছিল।

পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই এলাকা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার মাইলের ব্যবধানে বিভক্ত।

অরক্ষিত, শান্তিপ্রিয়, দারিদ্র্য দুর্গত বাঙালী হত্যা শুরু হয়। শত শত ছাত্র, রাজনৈতিক নেতাকে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হাজার হাজার সাধারণ, নির্দোষ বাঙালীকে বোমা ও গুলি মেরে হত্যা করা হয়। সাধারণ নির্বাচনের জয়ী দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং এর কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়।

সকল সংবাদ সংস্থা, টেলিভিশন সংবাদদাতা অথবা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের নিষিদ্ধ করা হয়। জেনারেল ইয়াহিয়া সমগ্র বিশ্বকে হিটলার ও স্টালিন পরবর্তী বর্বরতার ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞত রাখতে দৃঢ়বদ্ধ।

আমরা এই বিষয়ে কি করছি? আমরা এখনও জেনারেল ইয়াহিয়াকে সমর্থন দিচ্ছি।

এবং মঙ্গলবার সাধারণ সাংসদদের সভায় জনাব হিথ বলেন, যদি জনাব উইলসন আমাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির সাথে ঘটা কথোপকথনের বিস্তারিত জানাতে জোর না করতেন তবে তিনি খুশী হতেন।

একটি সমগ্র জাতিকে গুড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টা কোন বন্ধু সভায় আলোচনার অভ্যন্তরীণ বিষয় বস্তু নয়। যদি আমাদের কিছু নৌবহর দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বিক্রয়ের বিষয় কমনওয়েলথকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে, তবে কেন এই বিষয়ে নিশ্চুপ থাকবে?

কেন আমরা এই বিষয়টা জাতিসংঘে তুলে ধরছিনা? জনসম্মতি ছাড়া উগান্ডার ক্ষমতা হরণের পর আমরা খুব দ্রুতই জেনারেল আমিনকে চিহ্নিত করেছিলাম।

আমরা কি সাড়ে ৭ কোটি মানুষের ভোটকে স্বীকৃতি দেই না? নাকি বাংলার মানুষ অত্যন্ত গরীব, অনেক দুরের দেশ অথবা আমাদের স্বার্থে তারা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ না?

আমাদের সরকার কি সামান্য নৈতিক নিন্দা প্রকাশেও সাহস পায় না? নাকি ভিন্ন ধারার যৌন চলচ্চিত্রের হস্তমৈথুনরত শিক্ষকদের মতই এর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ?

আমাদের কি হয়েছে? আমরা কি আমাদের নতুন পাওয়া টেবিল টেনিস বন্ধু চীনাদের অখুশি করতে এতটাই ভীত? যারা সম্প্রতি জেনারেল ইয়াহিয়াকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।

গত শতাব্দীতে তুর্করা যখন আর্মেনিয়ার খ্রিষ্টানদের হত্যা করে তখন, গ্ল্যাডস্টোন (প্রাক্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ) তাদের বিরুদ্ধে সরব ভুমিকা পালন করেন। আজকে আফসোস, আমরা খুবই ক্ষুদ্র মানুষ দ্বারা শাসিত।

এখনও জেনারেল ইয়াহিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা এমন যে, সামান্য চাপ তাকে এইসব ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে সমীচীন হতে বাধ্য করবে।

 

আন্তর্জাতিক গণহত্যা

 

       ১৬ই এপ্রিলের পিস নিউজে রজার মুডি লেখেন,- ” সম্প্রতি পূর্ব বঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান যা ঘটিয়েছে এবং যা অর্জনের জন্য ঘটিয়েছে তার জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ থাকতে পারে না। যদিও বা ইয়াহিয়া খান সংঘাতহীন ভাবে পূর্ব বঙ্গের জনগণকে ভারসাম্যহীন অঙ্গরাজ্যে ( যা কখনই পুরনাঙ্গ যুক্তরাষ্ট্র ছিল না ) পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, এটা সর্বসম্মতভাবেই বিশ্বাসযোগ্য যে, করাচীর সামরিক সরকার পশ্চিমের খাদ্য যোগাতে পূর্বের জনগণের রক্ত ঝরানো অব্যাহত রাখবে। এবং এমন এক কৃত্তিম অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করবে যা শীঘ্রই পূর্ব বঙ্গের লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমি আমার নিজের মনে ধারণা করতে চেয়েছি , পশ্চিম পাকিস্তান বাহিনী এখন যা করছে তা ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ সময়কালীন হিটলারের নীল নকশার চেয়ে কম, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটা গণহত্যা। সাত্রের পরিভাষায় এটা আন্তর্জাতিক গণহত্যা এবং জাতিসংঘের গণহত্যা বিষয়ক সম্মেলনের ( যুক্তরাজ্য ১৯৬৯ ে যা স্বাক্ষর করে ) রীতি সুবিস্তৃতভাবে এই উক্তির সমর্থন করে। এই সময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও লিখিতভাবে পাকিস্তানকে দেউলিয়া অবস্থার সম্মুখীন করবে। এখন এটা খুবই পরিষ্কার যে, পাকিস্তান সরকার বাঙ্গালীর আত্মসমর্পণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। এখন উদ্দেশ্য একটাই হতে হবে, পূর্ব বঙ্গের যেখানেই সম্ভব হবে, পশ্চিম পাকিস্তান কতৃপক্ষের সকল কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা, যাতে তাদের সম্মুখ যুদ্ধ ছাড়া কোন উপায় না থাকে।”

 

ছাত্র কার্যক্রম সমিতি

 

       গত রবিবারের প্রদর্শনীর পর ছাত্র কার্যক্রম সমিতি যুক্তরাজ্য সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সহানুভূতি ও সমর্থন সংগ্রহের জন্য সংসদীয় পর্যায় তাদের তদবির বাড়িয়ে দিয়েছে।

       ছাত্ররা পাকিস্তান ক্রিকেট দলের পরিকল্পিত সফরের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ ও প্রদর্শনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে প্রত্যাখ্যান করার এবং প্রতিরোধের জন্য ইয়ং লিবারেল দল এবং সাধারণ সংসদ সদস্যদের ৩০ জন সদস্যের পূর্ণ সমর্থন যোগাড় করতে সক্ষম হয়েছে। ছাত্ররা চায়, খেলোয়াড়ি মনোভাবসম্পন্ন বৃটিশ জনগণ অনুভব করুক, যখন পশ্চিম পাকিস্তান সেনারা হিটলারি কায়দায় পূর্ব বঙ্গে গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন তাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা ক্রিকেতের মত আনন্দময় ও ন্যায়সঙ্গত খেলা যুক্তরাজ্যে খেলতে আসছে। যা কিনা বৃটিশ জনগণের ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষ অনুভূতির জন্য অবমাননাকর। সাড়ে ৭ কোটি জনতা পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের স্বাধীন দেশের জন্য লড়াই করছে। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিকাংশই পাঞ্জাবী খেলোয়াড় এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড সামরিক জান্তার অধীনে পরিচালিত সংস্থা। বৃটিশ খেলোয়াড়দের বুঝতে হবে, পশ্চিম পাকিস্তান কখনোই পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

 

ওয়েলস এ বাংলাদেশ কার্যক্রম সমিতি

 

কার্ডিফ থেকে জনাব নুরুল হোসেন লিখেছেনঃ –

       আমরা ওয়েলসের অভিবাসীরা গত ২৭শে মার্চ ” বাংলাদেশ কার্যক্রম সমিতি ” গঠন করেছি। এর প্রধাণ কার্যালয় কার্ডিফে ( ৮ নর্থ কোট স্ট্রীট, রোথ, কার্ডিফ, ওয়েলস। ফোন- কার্ডিফ ৪৪৭০২ )। ওয়েলসের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে বাঙালী জনগণ এই সভায় যোগ দেন এবং এই কার্যক্রম সমিতিকে সমর্থন জানান।

       আমরা ২৮শে মার্চ লন্ডনে বেঙ্গল স্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটির সাথে সম্মিলিতভাবে রাশিয়া, সিলন, আমেরিকা ও ভারতের দূতাবাসের সামনে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করি।

       আমরা কার্ডিফের এনজেল হোটেলের বাইরে জনাব হিথ এর সামনে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করি। জনাব হিথ ৩রা এপ্রিল কার্ডিফ সফরে আসেন এবং আমাদের প্রদর্শনীর প্রচারপত্র বিতরণ করেন এবং পূর্ব বঙ্গের গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা প্রকাহ করেন।

       আমরা ১১ই এপ্রিল কার্ডিফে এক সাধারণ সভার আয়োজন করি যাতে ৫০০ জন বাংলাদেশী কার্ডিফ, নিউপোর্ট, সোয়ানসী, ব্রিগেন্ড, পেন্টার, নিথ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন এবং ২৬ সদস্যের এক সমিতি গঠন করা হয়।

       বাংলাদেশী জনগণের জন্য ত্রানের অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি অর্থ সংস্থান সমিতিও গঠন করা হয়।

       ১৮ই এপ্রিল বাংলাদেশের সমসাময়িক অবস্থা আলোচনা এ কাঠামোগত পরিকল্পনার জন্য সমিতির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, জনগণ অন্তত এক সপ্তাহের বেতন কিংবা নিদেনপক্ষে ২৫ পাউন্ড প্রাথমিক অনুদান হিসেবে দিচ্ছে এবং যতদিন পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে ততদিন সপ্তাহে ১ পাউন্ড করে অনুদান দিতে থাকবে।

আমরা সমগ্র ওয়েলসের জনগণের মাঝে আমাদের প্রচারপত্র বিতরণ করেছি এবং বাংলা ভাষায় সাপ্তাহিক এক পাতার সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

 

“নিষ্ঠুরভাবে দমন নীতি”র উপর ফ্রাঙ্ক যুড এর বক্তব্য

 

       পশ্চিম পোর্টসমাউথের লেবার পার্টির সংসদ সদস্য জনাব ফ্রাঙ্ক যুড এক বক্তব্যে জানান, ” বৃটেনের উচিৎ পাকিস্তানে সকল সাহায্য কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া। প্রথমে পূর্ব বঙ্গের পুনর্বাসন এবং দ্বিতীয়ত    ‘নিষ্ঠুরভাবে দমন’ নীতির সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহযোগিতায় বৃটেনের অস্বীকৃতি প্রদর্শন “।

 

অবশ্যম্ভাবী বাংলাদেশ

 

       হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন অধ্যাপক – এডওয়ার্ড এস. মেসন, রবার্ট ডরফম্যান এবং স্টিফেন এ. মারগ্লিন স্বাধীন বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় ১লা এপ্রিলের এক বক্তব্যে জানান – ” পূর্ব বঙ্গের স্বাধীনতা অনিবার্য। সংযুক্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন , পূর্ব বঙ্গের সাধারণ মানুষের গণহত্যার মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তর হয়েছে এবং আজ না হোক কাল স্বাধীন পূর্ব বঙ্গের উৎপত্তি ঘটবেই। স্বাধীন বাংলাদেশ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র “।

 

লর্ড ব্রডওয়ের তিরস্কার

 

       ১৮ই এপ্রিল এক বক্তব্যে লর্ড ফেন্নার ব্রডওয়ে পূর্ব বঙ্গে পাকিস্তান সরকারের কর্মকাণ্ডকে হিটলার পরবর্তী বিশ্বের সবচেয়ে নির্মম ও বর্বরতর ঘটনা আখ্যা দিয়ে তিরস্কার জানান।

       ঔপনিবেশিক স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সভায় স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের সংকল্প গ্রহণ করা হয়।

 

পিন্ডির নির্যাতনের প্রতিবাদে যুগোস্লাভিয়া

 

       যুগোস্লাভিয়ার নির্ভরযোগ্য সংবাদপত্র কমিউনিস্ট যা ক্ষমতাসীন দল লীগ অফ কমিউনিস্ট এর মুল গণমাধ্যম এবং সরকার দলীয় মতামতে প্রকাশিত; ৭ই এপ্রিলের এক সম্পাদকীয়তে প্রকাশ করে, – ” পূর্ব বঙ্গের পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে এবং আমরা পাকিস্তান সেনা বাহিনীকে হাজার হাজার নিরীহ লোকের হত্যার জন্য দায়ী করি। পাকিস্তানের মর্মান্তিক অবস্থা দুর্ভাগ্যবশত এই বছরের ষষ্ঠ ঘটনা যেখানে সেনাবাহিনী রাজনীতির মুক্ত অঙ্গনে হস্তক্ষেপ করেছে “।

 

সোশ্যালিস্ট লেবার লীগ

 

       সোশ্যালিস্ট লেবার লীগের প্রধাণ প্রচার মাধ্যম, ওয়ার্কার্স প্রেস পত্রিকার সম্পাদক মাইক বান্ডা গত ১৮ই এপ্রিল লন্ডনের ইস্ট এন্ডের টইয়েনবি হলের জনারণ্যের উদ্দেশ্য বক্তব্য রাখেন। তিনি তার আবেগপূর্ণ বক্তব্যে স্বৈরাচারী ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মানুষের স্বাধীনতার জন্য তার সংস্থা ও পত্রিকার পূর্ণ সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন।

       বৃটিশ লেবার আন্দোলনের সর্বস্তরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য সমর্থন জানিয়ে জনাব বান্ডা বলেন, বাঙালীদের আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদের উপর বিশাল আঘাত। তিনি জাতিসংঘ ও তথাকথিত শক্তিশালী রাষ্ট্রের উপর বিশ্বাস না রাখার ব্যাপারে সতর্ক করেন। তিনি বৃটিশ কর্মজীবী শ্রেণীর সকলের কাছে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যে অবস্থিত সকল বাঙালীকে সমর্থনের আবেদন জানান।

 

পূর্ব বঙ্গে ত্রাণ সরবরাহে স্বেচ্ছাসেবী

 

পিস নিউজ ( ৫ ক্যালেডোনিয়ান রোড, লন্ডন এন-১ ) পত্রিকার সম্পাদক রজার মুডি ঘোষণা দেন – ” বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লন্ডনের একটি ছোট দলের পূর্ব বঙ্গে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যাবার সকল সম্ভাবনা ভেবে দেখা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের যেকোনো পরিণতি হতে পারে জানা সত্ত্বেও এই কাজে ইচ্ছুক লোকদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক দল গঠনের আশা প্রকাশ করছি। সম্ভাব্য সকল শারীরিক ভাবে সক্ষম এবং ব্যক্তিগত সমস্যামুক্ত স্বেচ্ছাসেবীদের যত দ্রুত সম্ভব পিস নিউজের কার্যালয়ে রজার মুডির বরাবর লিখিত আবেদন জমা দেবার আহবান জানানো হচ্ছে। দয়া করে ফোনে আবেদন জানাবেন না। অন্যান্য প্রশ্ন এবং সাহায্য প্রদান কিংবা উপদেশ চিঠির মাধ্যমে জানাতে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে “।