৩৩. ১৪ মে সম্পাদকীয় সংগঠন ও ইতিহাস ও কর্মসূচী

Posted on Posted in 6

কম্পাইলারঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

<৬, ৩৩, ৬১৯-৬২২>

শিরোনামঃ সম্পাদকীয়, সংগঠন ও সংগ্রামের ইতিহাস ও কর্মসূচী

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশপত্র*, টেক্সাসঃ ১ম সংখ্যা

তারিখঃ ১৪ মে, ১৯৭১

.

[*বাংলাদেশপত্রঃ বাংলাদেশ লীগ অফ আমেরিকা, কলেজষ্টেশন শাখা কর্তৃক মুদ্রিত, প্রকাশিত ও প্রচারিত।]

স্বাধীনতার ডাকে

বাংলাদেশে আজ রক্তগঙ্গা বইছে। বাঙ্গালীদের রক্তে হোলী খেলে পান্জাব দস্যু দল পৈশাচিক আনন্দে মত্ত। আমোদের ভাই –বোনেরা যখন অত্যাচারীর খড়্গ রুখে দাঁড়াতে গিয়ে নির্বিচারে জীবন বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করছেনা, তখন মার্কিন দেশের বিলাসময় পরিবেশের মধ্যে থেকে দেশের জন্য আমরা কি করছি? স্বাধীনতা আমরা পাবই, এ ব্যাপারে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। তবে, আন্দোলনে আমরা আমাদের দেশবাসীকে কতটুকুই বা সাহায্য করছি? ছিন্নবস্ত্রে, অনাহারে ও অন্নাভাবে থেকেও বাংলাদেশের বীর জনতা সৈরাচারী সাম্রাজ্যবাদের বেয়নেট শাসনকেও ভুলুন্ঠিত করছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই সংকটময় মূহুর্তে দেশবাসী আমাদের কাছে অনেক কিছু আশা করে। আজ আমাদের সামান্য আত্মত্যাগের ভয়ে ভীত হলে চলবেনা। কৈ আমরা এতটুকু আরাম আয়েশ বিশর্জন দিতে পেরেছি? হাজারো মানুষের রক্তের ঋনে গড়া এই সংগ্রামের ডাকে আমরা এককভাবে সাড়া দিতে না পারলে উত্তরসুরিা আমাদের ক্ষমা করবে না।

তাই আজ আমাদের একতাবদ্ধ হতে হবে। আসুন বাংলা মায়ের ডাকে সবাই একসাথে কাজ করে যাই। দলাদলি ও বিভেদ ভুলে গিয়ে মাত্র একটি লক্ষে পৌছাবার জন্য আমাদেরকে আত্মোৎসর্গ করতে হবে।

করণীয় আমাদের অনেক। প্রচারকার্যে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। গণতন্ত্র ও স্বাধীকার আদায়ে বাংলাদেশের বীর জনতার মহান আদর্শ ও আত্মত্যাগের সংগ্রাম বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। প্রচারকার্য এবং বাংলাদেশের দুর্গত মানবতার জন্য আর্থিক সাহায্যের একান্ত প্রয়োজন। এই মূহুর্তে আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আমা উচিত।

এই চরম সংকটকালে নির্বিকার হয়ে থাকলে চলবেনা। বিনা ত্যাগে স্বাধীনতার আকাঙ্খা করলে ভুল হবে। সংগ্রামহীন স্বাধীনতার নজির ইতিহাসে নেই। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে গড়া এই মুক্তির সংগ্রামকে আমরা ব্যর্থ হতে দেব না। বাংলার জয় হবেই।

জয় বাংলা/

 

কলেজষ্টেশানঃ আমাদের করণীয়

 

       গত নির্বাচনে অর্জিত গণতন্ত্রের অধিকার আদায়ের জন্য মার্চ মাসের প্রথম ভাগে শেখ মুজিবুর রহমান প্রদেশব্যাপী এক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনকে বানচাল করে দেবার জন্য পান্জাবী সৈন্যরা নির্বিচারে গণহত্যা আরম্ভ করে। এই ঘটনার প্রথম থেকেই আমরা কলেজষ্টেশানের বাঙ্গালী ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের জন্য কাজ শুরু করি। প্রথমতঃ একটি সামরিক পরিষদ গঠন করা হয়। তারপর আজ (১৪ই মে) মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের তিনজন সদস্য সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ সংগ্রামী ছাত্র সংস্থার সভাপতি, সাধারন সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। এছাড়াও অনেকে বিভিন্ন দ্বায়িত্ত নিয়ে স্বেচ্ছায় কাজে এগিয়ে আসেন।

.

পঁচিশে মার্চের আগে পর্যন্ত অনেক বার মার্কিন সিনেটর, প্রেসিডেন্ট নিক্সন, উথান্ট এবং বৃহৎ শক্তিবর্গের সরকার ও আরো অনেক প্রভাবশালী ব্যাক্তির কাচে পত্র ও তারবার্তা পাঠানো হয়- বাংলাদেশে রক্তপাত বন্ধ করা  ও জনগণের নির্বাচিত নেতাদের হাতে শাষনভার হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছে।

 

       পঁচিশে মার্চের অপরিনামদর্শী ঘটনা আমাদেরকে সাময়িকভাবে স্তম্ভিত ও বিহ্বল করে। কিন্তু বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষনার পর পরই পুরোদমে আমাদের প্রচারকার্য শুরু হয়। মাত্র এক ঘন্টার নোটিশে আমরা সকল সদস্য একটা জরুরী সভায় মিলিত হয়ে আমাদের ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারন করি। দুর্গত মানবতার সেবায় ব্যায় করবার জন্য মাথাপিছু কমপক্ষে একশত ডলার চাঁদা দেওয়ার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে এই সভায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রচারকার্যের ব্যয় বহনের জন্য মাসিক চাঁদার পরিমান নির্ধারণ করা হয়। প্রথম কিস্তিতে তিন হাজার ডলার তুলে নিউইয়র্কে কেন্দ্রিয় সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য এই যে অনেকে ব্যান্কে ধারের খাতার অঙ্ক বাড়িয়ে চাঁদা দিয়েছেন, অনেকে নির্ধারিত নিম্নমানের অনেক বেশি দিয়েছেন, এবং সকলেই যে কোন মূহুর্তে বাংলাদেশের জন্য সাধ্যমত সাহায্য করার অঙ্গিকার করেছেন।

 

       ছাত্র হিসেবে চাকার অভাব থাকলেও আমাদের কর্মপ্রেরণার অভাব নেই। কলেজশ্টেশন থেকে এ পর্যন্ত বহুমুখী প্রচারকার্য চালিয়েছি তার মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি উল্লেখযোগ্যঃ

 

       পঁচিশে মার্চের পর একশো সিনেটর, জাতিসংঘ প্রধান ও বৃহৎ শক্তির রাষ্ট্রপ্রধানগনের নিকট কয়েকদপা আবেদসপত্র ও তারবার্তা পাঠানো হয়। এখনও বিশেষ প্রয়োজনে তাদের নিকট পত্র  তারবার্তা পাঠানো হচ্ছে।

       বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামে ও দুর্গত মানবতার সাহায্যের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন শহরে মার্কিন নাগরিকদের স্বাক্ষরসহ ১১ জন প্রভাবশালী সিনেটরের কাছে ১৫০০ আবেদন পত্র পাঠানো হয়েছে।

       টেক্সাস এ এন্ড এম ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ও শিক্ষকদের মাঝে বাংলাদেশের সংগ্রামের সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রত্যাগত অনেক শিক্ষক আমাদের বিশেষ সাহায্য করেন। বিশ্বাবদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের সাথে দলবেধে দেখা করে এখানকার বাংলাদেশের দুর্গত ছাত্রদের জন্য আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস পাওয়া গেছে।

       পাকিস্তানে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন লক ও প্রাক্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দলের নেতা উলিসনের সাথে যথাক্রমে ডালাস ও অস্টিনে দেখো করে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করি এবং বাংলাদেশকে সাহায্য করার আবেদন জানাই।

       স্থানীয় বেতার,টিভি ও দৈনিক বাংলাদেশের উপর স্ক্ষাতকারে অংশগ্রহন করেছি। এছাড়াও হিউস্টনে বাংলাদেশ ছাত্রসংস্থার আয়োজনে ওখানকার টিভি ও বেতারে একই রকম আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছি।

       হার্ভাডের তিনজন বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদের লেখা “Conflict in East Pakistan: Background and Prospect” নামক নিরপেক্ষ রিপোর্টখানির পাঁচশ কপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে এবং বিশ্বব্যাপি প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এখানে ছাত্র সিনেটে বাংলাদেশের গণআন্দোলন দমনে পাকিস্তান সরকারের মার্কিন অস্ত্র শস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানানো হয়েছে।

 

 

 

********

 

বাংলাদেশ লীগ অফ আমেরিকাঃ

সংগঠন ও সংগ্রামের ইতিহাস

 

আমাদের কেন্দ্রীয় সংস্থা গড়ে উঠার পেছনে রয়েছে বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টা। ১৯৪৭ সালে প্রবাসী সিলেটী ব্যাবসায়ীরা নিউইয়রর্কে পাকিস্তান লীগ অফ আমেরিকা নামে বাঙ্গালীদের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। পরে এর নামকরন হয় ইষ্ট পাকিস্তান লীগ অফ আমেরিকা। সদস্য সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এই সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করা হয়। গত প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পর এ সংস্থার সদস্যবর্গ পাক সরকারের উদাসীনতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, বাংলাদেশে রিলিফের জন্য চাঁদা সংগ্রহ ও বাংলা ছবি দেখানো, জাতিসংগের সামনে বাংলাদেশকে আলাদা করার দাবী, একুশে ফেব্রুয়ারী উদযাপন, এছাড়া আরো বহুমুখী প্রচারকার্যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহন করেন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সংস্থার নাম বদলিয়ে বাংলাদেশ লীগ অফ আমেরিকা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সাথে এর সরাসরি যোগাযোগও স্থাপন হয়েছে।

শীঘ্রই কেন্দ্রীয় সংস্থার কর্মকর্তা নির্বাচিত হবে। এ ব্যাপারে সকল সংস্থা ও মেম্বারদেরকে পূর্বভাগে কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রের সাধারন সম্পাদক ফয়জুর রহমান বাংলাদেম লীগকে আরো জোরদার করে গড়ে তোলার জন্য মার্কিন ও কানাডাবাসী সকল বাঙ্গালীদের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।

 

       কেন্দ্রীয় সংস্থার ঠিকানাঃ

              ইষ্ট পাকিস্তান লীগ অফ আমেরিকা, ইনক

              ২৬৬৭ ব্রডওয়ে, নিউইয়র্ক, ১০০২৫

              ফোনঃ (২১২) ৮৬৬-৭৪৭৪

 

যোগাযোগের আবেদন

 

 

নিউইয়র্ক মূল কেন্দ্রকে সবরকমের সাহায্য ও সরাসরি যোগাযোগের জন্য সমস্ত আমেরিকা ও কানাডাকে কতগুলি উপকেন্দ্রে ভাগ করা হয়েছে। আমেরিকার দক্ষিন অঞ্চলের ৯ টি স্টেসের ভার আমরা কলেজষ্টেশন টেক্সাস এ গ্রহন করেছি। আমাদের আঞ্চলিক কেন্দের নাম – উপকেন্দ্রঃ দক্ষিনাঞ্চল। যে সমস্ত ষ্টেটে আমরা সদস্য শাখাগুলির সাথে একসংগে কাজ করতে চাই সেগুলো হলোঃ টেক্সাস, নিউমেক্সিকো, লুজিয়ানা, ওকলাহোম, আলাকমা, আরকানসা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা ও জর্জিয়া। এ সমস্ত ষ্টেটে বাঙ্গালী ছাত্র ও চাকুরিজীবি যারা আছেন তারা সবাই শীঘ্রই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার এলাকায় আপনি একা হলেও দুর্দিনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত প্রয়োজন।

 

আপনাদের নিজ নিজ এরাকায় বাংলাদেম লীগ অফ আমেরিকা শাখা গঠন করুন এবং শীঘ্রই আমাদের উপকেনেদ্র আপনাদের সংগ্রাম পরিষদ ও সদস্যদের ঠিকানা ও আপনাদের কার্যকলাপের বিবরন পাঠান। আপনাদের খবর “বাংলাদেশপত্র” এ ছাপা হবে।

 

আমরা যদি কোনভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি, তবে জানাতে দ্বিধা করবেননা। আমরা আরো ফলপ্রসুভাবে কাজ করতে চাই। প্রচারকার্যে এবং নিউইয়র্কের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগে আমরা আপনাদেরকে সাহায্য করবো। তবে চছাঁদা পাঠানো ও যে কোন জররী কাজের জন্য আপনারা মূল কেন্দ্রের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

 

 

একটি প্রস্তাবঃ

 

       আমাদের এই আঞ্চলিক কেন্দ্রে আরো সুষ্ঠুভাবে কার্য সমাধার জন্য সকল সদস্য শাখাকে নিয়ে শীঘ্রই একটা আনুষ্ঠানিক আঞ্চলিক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব এসেছে। এর মাধ্যমে আমাদের বর্তমান কর্মপ্রচেষ্টা আরো জোরদার করা যায়। প্রচারকার্য, অর্থ-সংগ্রহ, নিজেদের মধ্যে সমজোতা ও সহযোগিতার একটি নিয়মতান্ত্রিক ভিত্তি গঠন করাই আনুষ্ঠানিক সংগঠনের মূল লক্ষ্য হবে। পনেরই মে এক সাধারন সভায় আমরা এই প্রস্তাব বিবেচনা করবো। এ ব্যাপারে আপনাতের মতামত জানাবেন।

 

ভবিষ্যত কর্মসূচি

 

       শীঘ্রই আমরা কলেজষ্টেশান ও নিকটবর্তী শহরগুলোতে স্থানীয় মহলের কর্মকর্তাদের সাহায্যে চাঁদা সংগ্রহ অভিযান শুরু করব।

       বাংলাদেশের উপর টেক্সাস এ এন্ড এম ইউনিভার্সিটিতে আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন হচ্ছে।

       পত্র পত্রিকা ও বিদেশী খবরের কাগজে বাংলাদেশের উপর রচনা ও সংবাদ ছাপাবার আরো জোরদার চেষ্টা চালানো হবে।

       এখানে অনেকেরই স্কলারশীপ বা দেশ থেকে টাকা আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের জন্য চাকুরী বা অন্য কোন অর্থ সাহায্য জোগাড় করার চেষ্টা করা হবে।

       এ ছাড়াও আমাদের নিয়মিত প্রচারকার্য আরো সুষ্ঠুভাবে চালানো হবে।

       শীঘ্রই “বাংলাদেশপত্র”-এ বাংলাদেশের সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের উপর একটি সাহিত্য সংখ্যা বেরুবে। প্রবন্ধ ও যে কোন রকম সাহিত্যমূলক রচনা সম্পাদকের ঠিকানায় পাঠাবার জন্য আমাদের পাঠক ও শুভাকাঙ্খীদের অনুরোধ করা হচ্ছে।

 

       সম্পাদক, ”বাংলাদেশপত্র”

       বক্স- ২৩৭০

         কলেজষ্টেশান, টেক্সাস ৭৭৮৪০