৪। ৪ এপ্রিল সম্পাদকীয়

Posted on Posted in Uncategorized

<৬,৪,৭-৮>

শিরোনামঃ সম্পাদকীয়

সংবাদপত্রঃ জয় বাংলা

তারিখঃ ৪ এপ্রিল, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

আমরা বীরের জাতি। পৃথিবীর বীর জাতিগুলির তালিকায় সর্বাগ্রে বাঙ্গালিদের নাম অবশ্যই থাকিবে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে ট্যাঙ্ক, কামানের বিরুদ্ধে লাঠি, সাধারণ বন্দুক ইত্যাদি দ্বারা লড়াই করিয়া শত্রুকে ধ্বংস করিয়া দিতেছে তাহার তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে খুঁজিয়া পাওয়া দুষ্কর। পৃথিবীর অন্যান্য দুই এক জায়গায় এই ধরনের প্রতিরোধের কথা শোনা গিয়াছে। কিন্তু এমন ব্যাপকভাবে আর কোথায়ও প্রতিরোধ করা হয় নাই। বীর মুক্তিযোদ্ধারা-আল্লাহর উপর ভরসা রাখিবেন। জয় আমাদের হইবেই।

.

এতদিন বাঙ্গালিরা ঘুমন্ত সিংহের ন্যায় ছিল। আজ তাহারা জাগ্রত হইয়াছে। আজ তাহাদের গতি রোধ করিবার শক্তি কাহারও নাই।

.

গত কয়েক শতাব্দী তাহাদিগকে জাগাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে, অনেক জাগরণী গানও শোনান হইয়াছে। কিন্তু তাহাদিগকে সম্পূর্ণভাবে জাগাইতে একমাত্র বঙ্গবন্ধু সক্ষম হইয়াছেন। জয় বঙ্গবন্ধু !

.

অতীতে কে কি করিয়াছেন ভুলিয়া যান।

.

যে যা হাতিয়ার-লাঠি, বৈঠা, বন্দুক,রামদাও, বল্লম, বরশা, সড়কি, কাস্তে, হাতুড়ী, তীর-ধনুক ইত্যাদি যোগাড় করিতে পারেন উহা লইয়াই মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়ুন। বাংলার কামারেরা অস্ত্র তৈরি করিতে থাকুন। শুধু বন্ধুদের মুখাপেক্ষী না থাকিয়া নিজেদের যা আছে তাহার উপরও নির্ভর করিতে শিখুন।

.

সাঁওতাল, গারো, হাজং, চাকমা, মগ ও অন্যান্য ভাইয়েরা আপনাদের বিষমাখা তীর-ধনুক লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়ুন। সৈন্যদলে বিভিন্ন উপশাখা থাকে। আপনারা বাংলার ধনুক-বাহিনী হইবেন।….

.

প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রবর্গের কাছে স্বাধীন বাংলার সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর পক্ষ হইতে আমাদের আবেদন-প্রয়োজনমত আমাদিগকে সর্বপ্রকার সাহায্য দিবেন। বাঙ্গালিরা অকৃতজ্ঞ নহে। আপনাদের বিপদের দিনেও আমরা আপনাদের পাশে দাঁড়াইব। কে জানে কার উপর কখন বিপদ নামিয়া আসিবে।

.

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের জনগণ স্বাধীন বাংলার জনগণের প্রতি সমর্থন দান এবং তাহাদের সহিত একাত্মতা প্রকাশ করিয়াছেন। সেজন্য বাঙ্গালিরা তাহাদের নিকট কৃতজ্ঞ। আমরা সকল সময়েই প্রতিবেশীদের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখিতে চাহিয়াছি। আমাদের শত্রুরাই তাহাতে বাধা দিয়াছে। এবার শত্রুদের উৎখাত করা হইয়াছে এবং হইতেছে।…..

.

বন্ধ করুন

কিছু কিছু বর্বর ব্যক্তি আইন নিজেদের হাতে নিয়া বহু নিরস্ত্র লোকের উপর জুলুম চালাইতেছেন। উহা অবিলম্বে বন্ধ করুন। এইরূপ বর্বরদের উপর খোদার গজব আসিবে। জনসাধারণ ও অনন্যাদের প্রতি আবেদন আপনারা বাধা দিন।

.

কিছুসংখ্যক লোক শহর ত্যাগ করিয়া গ্রামে চলিয়া গিয়াছেন। অসমর্থ ব্যক্তিরা শহর ছাড়িয়া যান আপত্তি নাই। কিছু কিছু সমর্থ ব্যক্তিরাও শহর ছাড়িয়া পালাইয়াছেন। বহু চেনা মুখকেই নওগাঁ শহরে দেখা যাইতেছে না। এই সমস্ত লোকগুলিই সময়ে শহরে ফিরিয়া লম্বা লম্বা কথা বলিবে, উজির নাজির মারিবে, নওজোয়ান মাঠ চেঁচাইয়া ফাটাইবে। এ সমস্ত লোককে জানান যাইতেছে ” জয় বাংলা”র কলমরে খোঁচা খাইতে না চাহিলে অবিলম্বে শহরে প্রত্যাবর্তন করুন। জানেনই ত “pen is mightier than the sword” কলম তরবারির চাইতে শক্তিশালী।……

.

হিংসা সংক্রামক রোগের ন্যায়। কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতি হিংসাকে চাড়া দেওয়া অসম্ভব হইয়া পড়ে। যদি সম্পূর্ণ চাপা দেওয়া সম্ভব না হয় ( চাপা দিতে পারিলেই মঙ্গল) তবে উহাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখা কর্তব্য। আজ যে হিংসার স্রোতে কোন একটি বিশেষ শ্রেণীর লোকদের দিকে প্রবাহিত হইতেছে পড়ে উহা যে অন্য কোন দিকে পরিবর্তন করিবে না তাহা কি কেহ নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারেন? সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণে রাখা ভাল। সময় অতিক্রান্ত হইলে কোন কিছুকেই হাজার চেষ্টা করিলেও নিয়ন্ত্রণে আনিতে পারিবেন না। অত্যাচারীদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হইবে, তবে নিরপরাধ ব্যক্তিদের লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়া কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নহে। উহা নীতিবিরুদ্ধ এমনকি পবিত্র কোরানের নির্দেশেরও পরিপন্থী। অত্যাচারীর সঙ্গে লড়াই করা ধর্মীয় এবং নৈতিক কর্তব্য। হিংসার সঙ্গে উহার কোন সম্পর্ক নাই। বঙ্গবন্ধু নিজেও একাধিকার হিংসা পরিহার করিবার নির্দেশ দিয়াছেন।