৪৬. ৫ আগস্ট সম্পাদকের কথা

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ মিশকাত

<৬, ৪৬, ৬৫৯-৬৬১>

শিরোনামঃ  সম্পাদকীয়

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ নিউজলেটার শিকাগোঃ নম্বর ৬১

তারিখঃ ৫ আগস্ট, ১৯৭১

.

সম্পাদকীয়

আমাদের নিউজলেটারের এই সংখ্যা প্রকাশে বিলম্বের জন্য আমরা দুঃখিত। আমাদের দুজন সম্পাদকই শহরের বাইরে আছেন এবং আমাদের প্রধান সম্পাদক এখনো ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটাল হলে তদবিরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করি আমাদের পাঠকেরা আমাদের অপারগতাকে আমলে নিবেন।

এই নিউজলেটারটি আপনাদের হাতে পৌঁছানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে গালাঘর সংশোধনী আলোচনা এবং তা পাশ হবার সমূহ সুযোগ আছে। মঙ্গলবার, ৩রা আগস্ট ১৯৭১ অধিবেশনের দৈনিক আলোচ্য তালিকায় অন্তত এটা থাকছেই। অধিকাংশ কংগ্রেসম্যানের সহায়তা পেয়ে আমাদের তদবিরকারীরা আরো বেশি উৎসাহ পাচ্ছেন। সংশোধনীটি হাউজে পাশ হবার ব্যাপারে আমরা বেশ আশাবাদী।  

সেপ্টেম্বরের যেকোনো সময় যখন গরমের ছুটির পর পুনরায় অধিবেশন বসবে তখন স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনীও সিনেট আলোচ্যসূচিতে উঠে আসবে। সিনেটে দুদলেরই একটি শক্তিশালী অংশ এই সংশোধনীটির পক্ষে আছে। (বৈদেশিক সহায়তা নীতিমালা ১৯৬১ এর দুই সংশোধনী গালাঘর ও স্যাক্সবি-চার্চ , পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানী সেনা শাসকদের আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দেয়া বন্ধ রাখবে)। ইতিমধ্যেই  ৩২ জন সিনেটর এই সংশোধনীকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। কিন্তু আমাদের আমাদের আরো বেশি সমর্থন দরকার। অতএব দয়া করে আগস্ট মাস জুড়ে সিনেটরদের কাছে এই ব্যাপারে আরো চিঠি পাঠাতে থাকুন। যদি কোনো কারণে গরমের ছুটির আগে গালাঘর সংশোধনী পাশ নাও হয় তবুও কংগ্রেসম্যানদের কাছে চিঠি ও তারবার্তা চালিয়ে যেতে হবে।

আমরা একটি ন্যায্য দাবীর স্বপক্ষে লড়ছি। এতটা অন্যায় কারো সাথে হয়নি যতটা পাকিস্তান আমাদের সাথে করেছে। তাই তুলনামূলক ভাবে আমাদের দাবীর পক্ষে সমর্থন জোগাড় করা সহজ হবে। শুধু বেশি বেশি মানুষকে আমাদের এই ব্যাপারে জানাতে হবে এবং আমরা সমর্থন পেতে থাকবো। চলুন এই আগস্টে আমরা একটু আটঘাঁট বেঁধে নামি। আমরা যদি আমেরিকান সরকারকে ভঙ্গুর পাকিস্তান সরকারকে সহায়তা করা থেকে বিরত রাখতে পারি তবে আমাদের অর্ধেক যুদ্ধজয় হয়ে যাবে। বাকিটা মুক্তিবাহিনী সেরে ফেলবে, জয় বাংলা!

 

                                               দৃষ্টি আকর্ষণ

 

১। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত রেকর্ড হতে যাচ্ছেঃ বিডিএল একটি রেকর্ডিং কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা”র রেকর্ড সম্বলিত ৪৫ আর পি এম ডিস্ক বানানোর ব্যবস্থা করেছে।   ইতিমধ্যেই রেকর্ডিং এর পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের দুজন সুপরিচিত সঙ্গীতশিল্পী রেকর্ডিং এর জন্য জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছেন। রেকর্ডটি বাংলাদেশ ডিফেন্স লীগ অফিস থেকে সংগ্রহ করা যাবে। দয়া করে আমাদের অফিসে অর্ডার করুন। 

 

২) “বাংলাদেশ কেন?” নামের একটি বই (৪৬ পৃষ্ঠা) এর হাজারখানেক কপি আমরা পুনর্মুদ্রণ করি যা মূলত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনসংযোগ বিভাগ দ্বারা প্রকাশিত হয়। আমরা তহবিল বাড়াতে এবং প্রচারের জন্য এই বই বিক্রি করতে চাই। আমরা আমাদের পাঠকদের সাহায্য চাই। আপনারা নিজের জন্য কত কপি চান এবং কতগুলো আপনারা বিক্রি করতে পারবেন অনুগ্রহ করে আমাদের জানান।  আমরা বইটি প্রতি কপি ৫০ সেন্টে বিক্রি করতে আগ্রহী।

৩) আগস্টের কোন একসময় ভারতের শরণার্থী শিবিরে সিনেটর কেনেডি সফরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অনুগ্রহ করে সিনেটর কেনেডির কার্যকলাপের উপর প্রশংসাসূচক লিখা লিখুন এবং আপনার বন্ধুদেরও লিখতে বলুন।

 

৪) বাংলাদেশ ইমারজেন্সি ওয়েলফেয়ার আপিল ( বি ই ডাব্লু এ )এর জন্য প্রচারপত্রে বিন্যাস প্রেসে গিয়েছে। এটা তৈরী হওয়া মাত্র আমরা ভিন্ন ভিন্ন দলের কাছে পাঠাবো। প্রচারপত্র ব্যক্তিগতভাবে বিতরণ অথবা সম্ভাব্য দাতাদের পাঠানো হতে পারে।

আমরা আমাদের প্রত্যেক পাঠককে প্রচারপত্রের একটি কপি পাঠাবো পরবর্তী নিউজলেটারের সাথে। ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্র প্রথম নিউজলেটার প্রচার করে যাতে সুপারিশমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। যদি আপনি আপনার কপি না পেয়ে থাকেন অনুগ্রহ করে বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্র, ৪১৮ সেওয়ার্ড স্কয়ার, আপার্টমেন্ট ৪, ওয়াশিংটন, ডি. সি.  ২০০০৩ (ফোন: ২০২-৫৪৭-৩১৯৪) বরাবর আপনার ঠিকানা পাঠিয়ে দিন।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

নিচে একটি চিঠির খসড়া রয়েছে যা কংগ্রেস সদস্য এবং সিনেটরদের কাছে পাঠানো যেতে পারে।

যদি আপনার সিনেটর আর কংগ্রেস সদস্য এরই মধ্যে গালাঘর সংশোধনী বা স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনী-এর জন্য সমর্থন ইঙ্গিত করে থাকেন তবে এটা তাদের জন্য সহায়ক হত যদি আপনি তাদেরকে তাদের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সংক্ষেপে লিখতেন।

সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্য যারা জাতীয় ভোটারগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত (যেমন পাউল ম্যাক্লোস্কি বা হ্যারল্ড হ্যাগস) নিঃসন্দেহে ঐসব ব্যাক্তির মতামত আমলে নিবেন যারা অন্যরাজ্য থেকে তাদের লিখছে, বিশেষ করে একটি ইস্যুর উপর যা নিজ শহরের ভোটারদের খুব একটা প্রভাবিত করেনা।

 

প্রিয় সিনেটরঃ

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে আপনার উৎসাহের কথা জানতে পেরে আমরা পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য প্রশ্নে আমাদের উদ্বেগের কথা জ্ঞাপন করতে চাই।  বিগত কয়েক মাসে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থায় ক্রমান্বয়ে অবনতি হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে বিশ্ব ব্যাংক মিশনের আগের মাসের একটি রিপোর্ট কোনো সন্দেহ ছাড়াই নিশ্চিত করে ব্যাপক ভয়, মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যকলাপও থমকে গেছে । বাঙালিরা মৃত্যুভয়ে ভীত থাকে প্রতিদিন; পূর্ব-পাকিস্তানের অর্থনৈতিক জীবন প্রায় সম্পূর্নভাবে ভেঙে পড়েছে; আর খাদ্য পরিস্থিতি বেপরোয়া হয়ে উঠবার হুমকি দিচ্ছে।

যতদিন পর্যন্ত আমেরিকান সরকার পাকিস্তান সরকারকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে যাবে তার প্রভাবে বেসামরিক জনগণের উপর দমন পীড়নমূলক আচরণ ও বিরামহীন বর্বরতা চলতেই থাকবে। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুসারে আমেরিকান বিমান, সাঁজোয়া যান ও সাঁজোয়া সেনা বহনকারী যান পূর্বপাকিস্তানে ব্যবহৃত হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২৫ মার্চের জটিলতার পর থেকেই আমেরিকা থেকে পাকিস্তানে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র চারটি পাকিস্তানী জাহাজে করে পাঠানো হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরূপ সাহায্য পাঠানোর নিষিদ্ধ করেছে। সহায়তা সংঘের ১১ জন সদস্যের মধ্যে দশজনই এই সুপারিশ মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র সহায়তার ব্যবস্থা চালু রেখেছে। প্রমাণাদি, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য, পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধিদের নিরীক্ষণ এবং বিশ্বব্যাংক দলের রিপোর্টের পরও যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানকে সহায়তা চালু রাখাটা অমার্জনীয়। 

সুতরাং, আমরা আপনাকে সিনেটর স্যাক্সবি-চার্চ (গ্যালাঘর কংগ্রেসের সদস্য) কর্তৃক প্রস্তাবিত বিবেচনাধীন আইনের খসড়ার পরিবর্তনে সম্মতি প্রদানের জন্য অনুরোধ করছি। এই সংশোধনীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যাতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সহায়তা কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয় যতদিন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দ্বারা স্বীকৃত একটি উপযুক্ত ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রস্তুত না হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে কংগ্রেসের একটি দৃঢ় সংকল্পিত কার্যক্রমই যুক্তরাষ্ট্রকে এই নাজুক পরিস্থিতিতে অন্তর্ভুক্তি থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। দেশের মানুষকে বিরামহীনভাবে একটি নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থায় জিম্মি রেখে দমন করে যুক্তরাষ্ট্রের দুরভিসন্ধি অথবা পাকিস্তানের অভিসন্ধি, কোনভাবেই চলমান থাকতে পারেনা। এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বিনীত করে তুলছে। গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেখতে পাওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের আশায় আঘাত করেছে এবং এসব কারণে প্রায় ৭০ লক্ষ শরণার্থীর এক বৃহৎ জনস্রোত পার্শ্ববর্তী দেশে প্রবাহিত হয়েছে। এই ঘটনাটি সমগ্র উপমহাদেশের সার্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বিনীত