৫. ২১ জুন বাংলাদেশের রিপর্ট

Posted on Posted in 6

চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি

<৬,৫,৫৭৫-৫৭৭> অনুবাদ

শিরোনামঃ বাংলাদেশের রিপর্ট

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ নিউজ লেটার লন্ডনঃ নং ৭

তারিখঃ ২১ জুন, ১৯৭১

গ্যারিলা কর্মকান্ড বাড়ছে

স্বাধীনতা সংগ্রাম স্থিমিত হয়নি

 

অতি সম্প্রতি সিলেটে বেশ কিছু বেদখলকৃত জায়গায় হামলাকারি কমান্ড বাহিনীর সাথে ব্যাক্তিগতভাবে আমি ছিলাম। গত দেড় মাস ব্যাপি অভিযানে পাঁচশোর বেশি পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং গোলা বারুদ বাজেয়াপ্ত করে কমান্ডো ঘাটিতে আনা হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি জীপ এবং একটি মিলিটারি ট্রাক রয়েছে। নির্মূল করা পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের ইউনিফর্মগুলো শত্রুপক্ষ এবং তাদের অনুচরদের বিভ্রান্ত করতে ব্যাবহার করা হচ্ছে এবং ছাত্র গ্যারিলাদের অনেকে ছদ্মবেশে শত্রু শিবিরে অনুপ্রবেশ করতে স্বক্ষম হয়েছে। তারা রেডিও বা বার্তা বাহক হিসেবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদের ব্যাবহার করে ঘাঁটির সাথে যোগাযোগ রাখছে। একটি যুদ্ধনৌকা ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংস এবং স্থানীয় রাজাকার-তথ্য পাচারকারি-গুপ্তচরদের নির্মূল করার মাধ্যমে উত্তর সিলেটের অধিকাংশ এলাকা স্বাধীন করা হয়েছে।

আমরা ৩০টি  ক্যাম্প স্থাপন করে ফেলেছি যেখানে ৩০০০০ স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। অভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা, অফিসার, বেংগল রেজিমেন্টের সদস্যগন, মিলিশিয়া এবং কিছু সংখ্যক পুলিশ আমাদের সাথে  আছে, তারা শত্রুপক্ষকে ছোট ছোট লড়াইয়ে ব্যাস্ত রাখে আর গ্যারিলারা এই ফাঁকে ক্যাম্পে ঢুকে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের রেশন এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নষ্ঠ করে দেয়। ১০৩৪ মাইল ব্যাপি এলাকা জুড়ে আমরা শত্রুদের নাস্তানাবুদ করে যাচ্ছি।পশ্চিম বাংলা, আসাম এবং ত্রিপুরার নিকটবর্তী সকল পাকিস্তানি ফাঁড়ি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং আমাদের সামর্থের সবটুকু দিয়ে আসছে বর্ষায় এই ফাঁড়িগুলোর পূননির্মাণ আমরা ঠেকাব।

 

কৃষ্ণনগর প্রতিনিধির প্রতিবেদন

 

আমি গ্যারিলাদের একজন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এবং আমি নিজের চোখে আমার বন্ধুদের পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের হাতে খুন হতে দেখেছি।আমি কলকাতা পালিয়ে যাই এবং সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিই। আমি আমার প্রায় সব প্রিয়জনদের হারিয়েছি। আমার এখন প্রতিশোধ নিতে হবে। মৃত্যু আমাকে আর ভীত করে না। আমি মৃত্যুকে তার চরম বিভৎস রূপে দেখেছি। আমরা এখন বেশ তৎপর এখানে। আমাদের মুক্তি ফৌজ পাকিস্তানিদের ভালই শিক্ষা দিচ্ছে। উদ্বাস্তু শিবিরে অনেক সক্ষম পুরুষ আমাদের ফৌজে যোগ দিয়েছে। আমরা মনে করি সক্ষম পুরুষ যারা বন্দুক বা বর্ষা চালাতে পারে তাদের মুক্তি ফৌজে যোগদান করা উচিত এবং বৃদ্ধ, মহিলা, শিশু এবং অসুস্থরা উদ্বাস্তু শিবিরে থাকবে। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মুক্তি ফৌজে অংশগ্রহণ করতে দেখে আমাদের গর্ব হয়। তাদের এই অন্তর্ভুক্তি আমাদের বাহিনীকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। যদি বিহারীদের বেশিরভাগ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং বাংলার শত্রুদের সাথে যোগ দিয়েছে তারপরও আপনি অবাক হবেন আওয়ামি লীগ এবং ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টির প্রচুর বিশ্বস্ত বিহারী সদস্য আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। বাহিনী ত্যাগ করা দু’জন পাঠান সৈন্য আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। তারা আব্দুল গাফ্ফার খান এর অনুসারি। আমাদের অনেকে আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন জাতিস্বত্তার সৈন্যদের এই আগমনকে স্বাদরে আমন্ত্রণ জানাবে।

 

মুজিবনগরকে বাংলাদেশ অস্থায়ি সরকারের সক্রিয় প্রধান কার্যালয় হয়ত বলা যাবে না তবে এটাই এখান আমাদের দখলে এবং এখানে আমরা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হই।

 

গ্যারিলা যুদ্ধে পারদর্শি এমন কিছু প্রশিক্ষক আমাদের প্রয়োজন। ভারত এবং পাকিস্তানের আল-ফাতাহ থেকে একজন আমাদের কাছে আসতে স্বক্ষম হয়েছে এবং গ্যারিলা যুদ্ধে পারদর্শি এমন কিছু প্রশিক্ষক তারা আমাদের দিতে আগ্রহি যারা আমাদের ছেলেদের গ্যারিলা যুদ্ধে প্রশিক্ষণ দিবে।তিনি বললেন পাকিস্তানি সরকার রাজা হুসেনকে সমর্থন জানিয়েছে এবং তাকে অস্ত্র পাঠিয়েছে অনুদান হিসেবে প্যালেস্টানিয়দের মারার জন্য, তাই প্যালস্টানিয়রা খুশি মনে মুক্তি যোদ্ধাদের সাহায্য করবে। তিনি তাদের নেতা ইয়াসির আরাফাত এর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন

 

 

 

আজকের ঢাকা

 

জনাব শাইখ রহমান, ঢাকার একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট, তিনি জুনের ৭ তারিখ ঢাকা ত্যাগ করেন, গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক মার্টিন এডিনিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জনাব রহমান ঢাকার পরিস্থিতি বর্ণনা করেন এভাবে,” সাধারন মানুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকাতে এবং তাদের আর কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা আছে এমন লোকের তালিকার দৈর্ঘ্য ৬৩ পৃষ্ঠা এবং যেসকল বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গুম হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন অসামরিক নিরাপত্তা বাহিনী আলাদা তালিকা করে তদেরকে তদন্তের আওতাধীন করছে।

 

জনাব রহমান ব্যাবসায়ীদের নামের একটা তালিকা দিয়েছেন যাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ এর জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের আর কোন খবর পাওয়া যায়নি, খুব সম্প্রতি গুম হওয়াদের তালিকায় আছেন ফিলিপস কোম্পানির লোকাল এরিয়া ম্যানেজার, উইং কামান্ডার বাকি,  যাকে গত সপ্তাহের বুধবার ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, ঢাকাতে যেসব পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যাবসায়ী সবকিছু স্বাভাবিক শুনে আগমন করেন তারা পরিস্থিতি দেখে আঁৎকে উঠেন। ঢাকার বাইরে সড়ক পথে যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব। মুক্তি বাহিনী একটি ষ্টীমারে গুপ্ত হামলা করায় খুলনায় সকল প্রকার নৌ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলা ছাড়া অন্যান্য কেন্দ্রগুলোতে টেলিফোনে যোগাযোগ করাও বেশ দুরূহ। বন্দর নগর চট্টগ্রামে যাওয়ার একমাত্র উপায় আকাশ পথ তাও একটা ওয়ান ওয়ে টিকেট পেতে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়। দূরে থেকে হলেও মুক্তি বাহিনী তাদের উপস্থিতি জানান দেয়, যদিও তাদের অধিকাংশই বর্ডারের ওপারে চলে গেছে। সকাল ও সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রবল সম্প্রচার শোনা যায়, গত ১৭ মে স্ট্যাট ব্যাংক, দু’টি সিনেমা ঘর, একটি আধুনিক শপিং এরিয়া সহ ঢাকার বেশ ক’টি ভবনে ৮টি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। পাটের শহর নরসিংদি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত।