৬২. ১০ ডিসেম্বর নভেম্বর বাংলাদেশ আন্দোলনের খবর

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ মোহাঃ তুর্য রহমান এবং তানুজা বড়ুয়া

<৬, ৬২, ৬৯১-৬৯৪>

শিরোনামঃ বাংলাদেশ আন্দোলনের খবর

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ নিউজলেটার শিকাগোঃ নং ১৪

তারিখঃ ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১

.

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ কনফারেন্স

১০ থেকে ১৮ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে ‘পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনায় আমেরিকার প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে পরামর্শ’ শীর্ষক একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন আয়োজন করে চার্চ দলের প্রতিনিধিরা (ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ চার্চেস, দ্যা ফ্রেন্ডস এবং ইউনিটারিয়ান ইউনিভারসালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন সহ) সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার ১০০ জন আলোচিত জননেতা এতে অংশ নেন।

       প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতা রাখেন সিনেটর কেনেডি। সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করেন এবং ভারতের শরণার্থী শিবিরের ভয়াবহতা বর্ণনা করেন যেখানে দৈনিক প্রায় ৪৩০০০ শিশু মৃত্যুবরণ করছে (কেনেডির ভাষ্যমতে)।

       অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক এডওয়ার্ড ডিমক, যিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয় ভাষা ও আঞ্চলিক কেন্দ্রের পরিচালক। (অধ্যাপক ডিমক-এর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণের অনুলিপি বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার , রাস্তা-৪২৩৫ এসআর, ওয়াশিংটন ডি.সি.–তে পাওয়া যাচ্ছে)।

       পররাষ্ট্র দফতরের পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বিভাগের পরিচালক ব্রুস লেইঙ্গেন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যাপারে গভীর আলোকপাত করেন কিন্তু প্রশাসনের নীতির প্রতি কোন বিশ্বাসযোগ্য সমর্থন আনতে ব্যর্থ হন।

তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যাক্ত করেন, পশ্চিম পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে যে মুজিব বেঁচে আছেন।

       সম্মেলনে পাকিস্তান এম্বাসির প্রধান সচিব জনাব মুজাহিদ হোসেন এর বক্তৃতা দেয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মিশনের জনাব এস. এ. এম. এস. কিবরিয়া-র নাম দেখামাত্র তিনি অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। (পরবর্তীতে পাকিস্তান দূতাবাস এ সম্মেলনের ব্যাপারে নিন্দা জ্ঞাপন করে)

       বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জনাব এনায়েত করিম এবং তারপর বক্তব্য রাখেন ভারতীয় দূতাবাসের রাজনীতি বিষয়ক মন্ত্রী জনাব মহারাজাকৃষ্ণ রাসগোত্রা।

       সর্বশেষ বক্তব্য রাখেন প্রতিনিধি পিটার ফ্রেলিঙ্গুয়েশেন, যিনি সম্প্রতি ভারতের শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ থেকে ঘুরে এসেছেন।

       সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ডঃ হোমার জ্যাক, ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অফ রিলিজিয়ন ফর পিস’- এর সাধারণ সম্পাদক, আরও ছিলেন ‘কাউন্সিল ফর ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল একশন, ইউনাইটেড চার্চ অফ ক্রাইস্ট’ এর পরিচাল্ক হ্যারি এপেল হোয়াইট, ‘ ইউনিটারিয়ান ইউনিভারসালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন অফিস’ এর পরিচালক রবার্ট জোন্স, ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ চার্চেস’ এর আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী বিভাগের ডঃ এলান প্যারেন্ট, এবং ‘ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন’ এর এডওয়ার্ড স্নিডার।

 

 

 

বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন এর চিঠি

বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসার পর বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন, যুক্তরাজ-এর সাধারণ সম্পাদক ৪ নভেম্বর,১৯৭১ তারিখে সকল ডাক্তারদের প্রতি নিম্নের চিঠিটী প্রকাশ করেনঃ

 

সুপ্রিয় সহকর্মীগণ,

       অবস্থা অতীব শোচনীয়। ঔষধ এবং গরম কাপড়ের ব্যাপক সংকট চলছে। সেপ্টেম্বরে সেনাপ্রধান হাসপাতাল পরিদর্শন করেন, অক্টোবরে বাংলাদেশের মাননীয় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। সেনাপ্রধান আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেনাপ্রধান আমাদের আরও তিনটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছেন, এমনকি এর অন্যথা না করার জন্য অনুরোধ করেছেন। যত তাড়াতাড়ি এই কাজ সম্পন্ন হবে, দেশের যুদ্ধে আমরা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবো।

       বিগত দুই মাসে আমাদের যা যা দেয়া হয়েছে-

       -মুক্তিবাহিনীর চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা

       -চিকিৎসা সরঞ্জাম (৫০০০ পাউন্ড ঔষধ ইত্যাদি)

       – বস্ত্র (২০০০ পাউন্ড)

 

       নিম্নবর্ণিত কাজসমূহে অতিসত্বর আপনাদের সাহায্য প্রয়োজন-

       ১- প্রথম বাংলাদেশ হাসপাতালটি স্থাপনের জন্য ডাঃ মবিন অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন। উনি বিগত ছয় মাস যাবত ওখানে কাজ করে যাচ্ছেন। খুব শীঘ্রই তাঁকে বদলি করা প্রয়োজন। তিন মাসের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের গুরুভার নিতে আগ্রহী থাকলে আপনারা যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

       ২- অনুগ্রহপূর্বক আপনার বেতনের ১০ শতাংশ আমাদের দেয়ার চেষ্টা করুন, উক্ত অর্থ ব্যাঙ্কার অর্ডারের মাধ্যমে সহজেই সংগ্রহ করা যাবে।

       ৩- ঔষধের ব্যাপারে, স্থানীয় চিকিতসকদের সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের বিনামুল্যে পাওয়া নমুনাগুলো অনুদানের জন্য অনুরোধ করুন। এস্পিরিন, কাশি প্রতিরোধী এন্টিবায়োটিক, টিটেনাস টিকা, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ঔষধ- সবগুলোই প্রয়োজন।

       ৪- গরম কাপড় দানের জন্য সকল্কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। মুক্তিবাহিনীদের ঠান্ডায় মারা পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে তাঁদের মৌলিক চাহিদাটুকু অন্তত পূরণ করা প্রয়োজন। এসব সামগ্রী যুক্তরাজ্য থেকে সহজেই পাঠান যাবে। উলে বোনা স্কয়ার একসাথে জুড়ে দিলে বেশ ভালো কম্বল বানানো যায়। অনুগ্রহ করে এসব দিয়ে আমাদের সাহায্য করুন।

       ৫-যুক্তরাজ্যের সকল বাংলাদেশী ডাক্তারদের নাম আমাদের ডাকপ্রেরণ তালিকায় লিপিবদ্ধ নেই। এব্যাপারে আপনাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন এর তালিকায় যেসকল ডাক্তারদের নাম এখনো লিপিবদ্ধ করা নেই, ব্যাক্তিগত উদ্যোগে সেইসব নাম খুজে বের করে আমাদের জানানোর জন্য অনুরোধ করছি। কোন ঠিকানা পরিবর্তন হলে তৎক্ষণাৎ আমাদের জানানোর ব্যাপারেও উৎসাহিত করা হচ্ছে।

       গতকাল বাংলাদেশ থেকে মুক্তি ফৌজের খবর জানিয়ে লেখা একটি চিঠি আমি পাই। আমাদের মুক্তিবাহিনী ছাতক দখল করে পাকিস্তানি বাহিনীকে সুনামগঞ্জের দিকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। চিঠিতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের প্রতিবেদনের একটি গোপন তথ্য ছিল, যাতে জুলাই পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হতাহতের ব্যাপারে বর্ণিত আছে।

.

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকা, হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা ২৬-০৭-১৯৭১ পর্যন্ত

হাসপাতালে আনার পর মৃতের/নিহতের মোট সংখ্যা— ৭,৪৯৩                                                                    

মারাত্মক আহত মোট সৈন্যের সংখ্যা — ৫,৬৪৩

মোট আহত সৈন্যের সংখ্যা— ৪,৮৩০

সাপের কামড়ে মৃত মোট  সৈন্যের সংখ্যা — ১৪৭

পরবর্তীকালে অন্যত্র স্থানান্তরিত মানসিক ভারসাম্যহীন সৈন্যের সংখ্যা — ২৪৬

       ———-

মোট — ১৮,৩৫৯                                              

.

আমাদের প্রকল্পে ব্রিটিশ সর্বসাধারণের আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা  সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি, এবং আশা করছি “ভিয়েতনাম  এর জন্য  চিকিৎসা সহায়তা” এর অনুরূপ একটি চিকিৎসা সেবা কমিটি  প্রতিষ্ঠা করতে পারবো । প্রতি ৪-৬ সপ্তাহ নাগাদ আমরা আপনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবো।

যেসব বাঙ্গালী স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছেন না তাদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখা অত্যন্ত জরুরী। চিকিৎসক এবং ওষুধ ছাড়া আমাদের যোদ্ধাদের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি এবং আমাদের তা করতেই হবে।

বিনীত

এ টি এম জাফরুল্লাহ চৌধুরী

মহাসচিব

.

মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ কর্তৃক বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন এর সভাপতিকে প্রেরিত চিঠি

প্রতি

ডাঃ এ. এইচ. এস. রহমান

সভাপতি

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন,

প্রিয় ডাঃ রহমান,                                                               অক্টোবর ১৩, ১৯৭১                                                                                                                              

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর  সাময়িক যুক্তরাজ্য প্রত্যাগমনের সুযোগে আমি আপনাকে লিখছি, এবং যুদ্ধ ময়দানে চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ঔষধপত্রের জন্য হাসপাতাল স্থাপনে ডাঃ জাফরুল্লাহ এবং ডাঃ মবিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য আমি আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। এ পর্যন্ত তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে একটি হাসপাতাল স্থাপন করেছেন, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাঁশের কুড়েঘরে স্থাপিত হলেও, এটির একটি ভালো হাসপাতাল হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ কথা বলাই বাহুল্য যে, চিকিৎসা সুবিধা এবং সরঞ্জামাদি প্রেরণে আপনাদের আগ্রহ এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশাবাদী , যা ডাঃ জাফরুল্লাহর নিবিড় তত্ত্বাবধানে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হবে বলে আমি নিঃসন্দেহ।

                                                                                                                   বিনীত

এম. এ. জি. ওসমানী                                                                                                                           .

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিন

মুক্তি বাহিনিকে সহায়তা করুন

আপনি যদি একজন চিকিৎসক হয়ে থাকেন, তবে আপনার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা মুক্তিবাহিনীর প্রয়োজন। আপনি তিন মাস মুক্তিবাহিনীর হাসপাতালে সেবা প্রদান করতে পারেন। ডাঃ জিল্লুর রহমান আতহার এম. ডি. (808 Hillwood Blvd., Nashville, TN 37209, Phone (615) 356-3912) উত্তর আমেরিকার চিকিৎসা কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন করছেন এবং যুক্তরাজ্য ভিত্তিক বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। মুক্তিবাহিনীর হাসপাতালের জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে অংশগ্রহণ করবেন এমন চিকিৎসকদের তালিকা তৈরিতে সহায়তা করতে তার সাথে যোগাযোগ করুন। যুক্তরাজ্যের মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের সাথে আপনি চাইলে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন (9A Wotton Road, London, NW2, U.K.)।

অনুগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর জন্য ওষুধ, গরম কাপড় এবং অর্থ সাহায্য প্রেরণ করুন।  মুক্তিবাহিনীর জন্য বিনামূল্যে বিমানযোগে ওষুধ প্রেরণ সংক্রান্ত তথ্যাদি এবং আর্থিক  সাহায্য পাঠানোর মাধ্যম সম্পর্কে জানতে ডাঃ মুহাম্মদ ইউনুসের সাথে যোগাযোগ করুন (500 Paragon Mills B-7, Nashville, TN37211, Phone (615) 833-3064)।