৬ দফা ও ১১ দফার প্রশ্নে কোন আপোষ হবে না কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের সহযগিতা চাওয়া হবেঃ শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা

Posted on Posted in 2

<2.144.614>

শিরোনামসূত্রতারিখ
৬ দফা ও ১১ দফার প্রশ্নে কোনো আপোস হবে না কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা চাওয়া হবেঃ শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণাপাকিস্তান অবজারভার৪ জানুয়ারী, ১৯৭১

 

পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সহযোগিতা চাওয়া হবে

সংবিধান ছয় দফা এবং এগার দফার উপর ভিত্তি করে হবে

৩ জানুয়ারি, ১৯৭১ এ মুজিবের দৃঢ় বক্তব্য

আওয়ামি লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান রবিবার ঢাকায় বলেন যে দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান ছয় দফা এবং এগারো দফার ভিত্তিতে হবে।

আওয়ামি লীগের নব-নির্বাচিত এমএনএ এবং এমপিএ দের শপথ গ্রহণ উপলক্ষ্যে রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনভায় ভাষণ দান করছিলেন।

যদিও, আওয়ামি লীগ নেতা বলেন যে সংবিধান রচনাকালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চাইবেন।

গত বছর ৭ই জুন রেসকোর্স ময়দানের জনসভার পর এটা ছিল তাঁর প্রথম উপস্থিতি যেখানে তিনি এটি বলেন। তিনি বলেন নির্বাচন শেষ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলার জনগণ তাদের সংগ্রামের প্রথম ধাপে জয়ী হয়েছে। তিনি জনতাকে মনে করিয়ে দেন তারা যেন মনে না করে যে নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে তাদের সকল দাবি অর্জিত হয়েছে।

সহযোগিতা

তিনি বলেন, “পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ার পরও আমরা পশ্চিম পাকিস্তানী জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চাই না তা আমি বলতে চাই না।” তিনি বলেন যে, “অবশ্যই আমরা সংবিধান রচনার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানী জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চাই। কিন্তু পলিসির মৌলিক ব্যাপারগুলোতে কোন ছাড় দেয়া হবে না।”

এই বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে ছয় দফা এবং এগারো দফা এখন আর তাঁর কিংবা তাঁর দলের সম্পত্তি নয়। গণভোট ছয় দফা এবং এগারো দফার উপর ভিত্তি করে হয়েছিল। আওয়ামি লীগ এখন এটি আর পরিবর্তন করতে পারে না। আওয়ামি লীগ প্রধান ঘোষণা করেন যে, কেউ আমাদের ছয় দফার উপর ভিত্তি করে সংবিধান রচনা করা থেকে থামাতে পারবে না।

কিভাবে বাংলাদেশের মানুষকে অতীতে মূল্যায়ন করা হত সেই বিষয়ে শেখ সাহেব বলেন অতীতে আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হত এবং  দেশের প্রতি আমাদেরআনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হত। “আমাদের উপর অনেক অবিচার হয়েছে। আমরা এর ব্যথা বুঝি। অতএব, আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের প্রতি ন্যায় বিচার করব।”   

<2.144.615>

 

বাংলাদেশের অতীত ত্যাগসমূহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হিসেবে “আমরা করাচিকে পাকিস্তানের রাজধানী হতে দিয়েছি এবং ছয়জন পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাকে ঐ প্রদেশের কোটা হতে সংবিধান পরিষদে আসন দেয়া হয়েছে”।

তিনি বলেন, “আবারো বলতে চাই, আমরা দেশের জন্য সংবিধান রচনা করব কারণ আমরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি। পাকিস্তানের মানুষ এই সংবিধান গ্রহন করবে। যারা বাধা সৃষ্টি করতে চায় তাদের দূর করা হবে।”

ছয় দফা ভিত্তিক সংবিধান

ষড়যন্ত্র

 

শেখ মুজিব তাঁর ৫০ মিনিট ব্যাপী বক্তৃতায় নির্বাচন পরবর্তী কিছু ঘটনার উল্লেখ করলেন এবং বলেন যে নির্বাচন বানচালের যে ষড়যন্ত্র নির্বাচনের পূর্বে ছিল সেটি এখনো চলছে। তিনি বলেন যে ২৬ বছর বয়সী পাবনার আওয়ামীলীগ এমপিএ আহমেদ রফিক, খুলনার মমতাজ হত্যা এবং হারুনের মৃত্যুর ঘটনা এ ষড়যন্ত্রের কয়েকটি প্রমাণ। তিনি বলেন, “আহমেদ রফিককে রাতের আঁধারে খুন করা হয়েছে। তাকে ১৩ বার ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। মমতাজকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং আমার ছোট ভাই হারুনকে জীপগাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।”

ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য জনগণকে প্রস্তুত হবার ডাক দিয়ে তিনি বলেন “এমনও হতে পারে যে দাবী আদায়ের এ সংগ্রামে আমিও হারিয়ে যেতে পারি। তাও যদি হয় সংগ্রাম চালিয়ে নেবার দায়িত্ব আপনাদের।”    

ইয়াহিয়াকে ধন্যবাদ দেয়া হয়েছে

শেখ মুজিব নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কথা রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ধন্যবাদ জানান। যাইহোক, তিনি বলেন যে তার (ইয়াহিয়ার) অধস্তনদের একটি অংশ রয়েছে যারা নির্বাচনের ফলাফলকে নস্যাৎ করে দেবার যে ষড়যন্ত্র করেছিল।  শেখ মুজিব বলেন যে সাম্প্রতিক কালে কিছু ষড়যন্ত্রকারী ঢাকায় এসেছিল এবং গোপনে মিটিং করেছে। তিনি বাংলাদেশ এবং ঐ সকল ষড়যন্ত্রকারীদের আত্ন-পরিচয় জিজ্ঞেস করেন, তিনি সতর্ক করে দেন যে বাংলার মানুষ এই সব ষড়যন্ত্র লাঠি বাঁশ দিয়ে মোকাবেলা করবে।

তিনি বলতে থাকেন, “আমরা শুধু বাংলাদেশেরই নই সমগ্র দেশের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তাই, দেশ শাসনের অধিকার আমাদের।” তিনি বলেন যে তিনি এবং তাঁর দল পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, ফ্রন্টিয়ার এবং সিন্দের দরিদ্র্য মানুষের অধিকার রক্ষা করবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ এবং এই সকল প্রদেশে মানবতা অভিন্ন ভাবে ধুকছে। যাইহোক, আওয়ামি লীগ প্রধান আবেগতাড়িত হয়ে বলেন যারা গত ২৩ বছর ধরে আমাদের ক্ষতি করেছে তাদের সাথে কোন সমঝোতা হবে না।

এরপর তিনি বলেন যে তিনি অথবা তাঁর দলের সদস্যবৃন্দ মন্ত্রী অথবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজনীতিতে আসে নি। তারা রাজনীতিতে এসেছে সাধারণ মানুষকে সেবা করার জন্য, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তারা সাধারণ মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে চেয়েছে এবং তারা তা করেছে।

 

<2.144.616>

 

কর্মকর্তাদের প্রতি সতর্কতা

আওয়ামি লীগ প্রধান সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেন গত দশকে আইয়ুব শাসনামলে গড়ে ওঠা মনোভাব কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন যে, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের সাথে চলতে পারে না, তারা কর্তার মত আচরণ করে। তিনি বলেন, “আপনারা যদি সাধারণ মানুষের প্রতি আপনাদের আচরণ পরিবর্তন করতে না পারেন, আমরা শুধু জনগণকে আপনাদের ঘর বাড়ি দেখিয়ে বলব তিনি ভাল মানুষ নন, তাকে ছুড়ে ফেলে দিন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩০৩ জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে ব্যাবস্থা নিয়েছিল আমরা সে রকম কোন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি না।” 

আওয়ামি লীগকে প্রতিহত করা

নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অংশের ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামি লীগকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে এই প্রদেশে প্রচুর পরিমাণে অর্থ এসেছে। বলা হয়েছিল যে ইসলাম বিপদের মুখে। তিনি প্রশ্ন  করেন যে নির্বাচনের পর কাউকে নামাজ পড়তে অথবা রোজা রাখতে বাধা দেয়া হয়েছে কি না। তিনি বলেন যে যারা অপ্রয়োজনীয় ভাবে রাজনীতিতে ইসলামকে যুক্ত করেছে, ইসলামে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।

তারপর তিনি বলেন যে বিভিন্ন উপায়ে নির্বাচনে আওয়ামি লীগের এমএনএ এবং এমপিএ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একবার এরকম চেষ্টা করা হয়েছিল পিওপি এর সহযোগিতায় চারটি দলের জোট গঠন করে এবং তারপর ইসলামিক ফ্রন্টের নামে এরকম চেষ্টা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন নির্বাচনে সকল আগাছা দূর হয়েছে।

তাঁর সংগঠনের ব্যাপারে তিনি বলেন যে তিনি তাঁর দলের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রত্যেক পাড়া এবং মহল্লাকে আওয়ামি লীগের দূর্গ বানাতে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে সন্ত্রাসীরা এবং তাদের দালালেরা যে অন্ধকার সৃষ্টি করেছিল তা আওয়ামি কর্মীরা প্রবলভাবে তা দূর করে দিয়েছে। তিনি তাঁর কর্মীদের এরূপ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। তিনি বাঁশের লাঠি এবং সুন্দরি গাছের লাঠি দিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করার উপদেশ দেন। শেখ মুজিব বলেন যে ডাকাতি করে বিপ্লব করা যাবে না।

তিনি তাঁর কর্মীদের প্রতি বলেন, “তোমরা তোমাদের লাঠি প্রস্তুত রাখো কিন্তু আমি না বলা পর্যন্ত ব্যবহার করবে না।” তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, “আমাকে আঘাত করা হলে আমি পাল্টা আঘাত করব।” তিনি তাঁর কর্মীদের প্রথমেই আঘাত করতে নিষেধ করেন।

শেখ মুজিব উৎফুল্ল জনতাকে বলেন যদি কেউ এই শপথ ভংগ করে তিনি সহ তাঁর দলের যেকোন সদস্যকে জীবন্ত পুতে ফেলতে।

সভায় উপস্থিত নারী শ্রোতাদের প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, নারীদের আর দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হিসেবে দেখা হবে না। যদি দরকার হয়, বিশেষ আইন করে নারীদের পুরুষদের মত সমান অধিকার দেয়া হবে।

শেখ মুজিবুর রহমান সকল রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং রাজনৈতিক কর্মী এবং ছাত্রদের বিরুদ্ধে করা সকল কেস উঠিয়ে নেয়ার দাবি জানান। শেখ মুজিব আরো বলেন, “তাদের আর কতদিন জেলে রাখা হবে? যদি আপনারা অতি সত্ত্বর তাদের মুক্তি দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার পর খুব শীঘ্রই এটি করব।”

শহরে বাড়তে থাকা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে শহরে নিরাপদে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি যতাযথ কতৃপক্ষকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেন।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা

বক্তৃতার শুরুতে তিনি আন্দোলনে আত্নত্যাগকারী শহীদদের প্রতি বিশেষ করে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ৭ জুনের আন্দোলন এবং ১৯৬৮ এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুস্থানের কথা উল্লেখ করে শহীদদের প্রতি আবেগঘন প্রশংসাসূচক স্তুতি করেন।

তিনি বলেন, “আমি এমএনএ  এবং এমপিএ দের সাথে একসাথে প্রতিজ্ঞা করছি যে শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না।”

তারপর তিনি বলেন যে নির্বাচনের বিজয় চূড়ান্ত বিজয় নয়। যাই হোক, তিনি বলেন যে নির্বাচনে বিজয় তার নিজের জয় অথবা তার দলের বিজয় নয়। এটি ছিল বাংলার সাত কোটি মানুষের বিজয়, পাকিস্তানের সমগ্র শোষিত মানুষের বিজয়।

তিনি বলেন যে বাংলার মানুষ কখনোই শহীদদের ভুলবে না, তাঁদের সবসময়ই স্মরণ করা হবে।

সাধারণ জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন নির্বাচনের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে দাবিদাওয়া সম্পর্কে খুব বেশি খুশি হওয়ার কারণ নেই। তিনি বলেন যে শহীদদের রক্তের ঋণ রক্ত দিয়েই শোধ করা লাগতে পারে। তিনি সাত কোটি জনতাকে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানান (যদিপ্রয়োজনহয়)।

নির্বাচন সম্বন্ধে আওয়ামীলীগ প্রধান বলেন, “আমাদের কোন অর্থ ছিল না, গাড়ি ছিল না, সম্পদ ছিল না কিন্তু আমাদের ইমান ছিল, সাধারণ মানুষ আমাদের সাথে ছিল এবং সেটাই আমাদের সম্পদ।”