৬ দফা চাপিয়ে দেয়া হবে নাঃ শেখ মুজিব

Posted on Posted in 2

<2.162.658>

 

মুজিব যেকোন ভালো উপদেশ বা পরামর্শ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক

পশ্চিমের জাতীয় পরিষদ সদস্যরা  সংবিধান তৈরীতে  আমন্ত্রিত

ছয় দফা চাপিয়ে দেওয়া হবে না

 

আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান  আজ জোর দিয়ে বলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সব জাতীয় পরিষদের সদস্যদের উচিত অধিবেশনে যোগ দিয়ে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেওয়া। ঢাকা চেম্বার অব  কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন “ আমাদের অবশ্যই বসতে হবে, আলোচনা করতে হবে এবং একটি সংবিধান তৈরি করতে হবে “।

অধিবেশনে যোগদান বিষয়ে ভুট্টোর পূর্বশর্ত উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন যে কাউকে ক্ষমতা তার নেই। তিনি বলেন ‘’ আমি আশ্বাস দেয়ার কে “।তিনি বলেন যে যদি কোন স্বতন্ত্র সদস্য কোন যৌক্তিক কথা বলেন তবে তা গ্রহণ করা হবে। ৬ দফা যে চাপিয়ে দেয়া হবে না সে কথাও তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ছয় দফা কর্মসূচি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য উপস্থাপন করা হয়নি। “বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন আমরা চায়, সেই একই অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন যেন পাঞ্জাব, এনডব্লিউএফপি, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান এর লোকেরাও ভোগ করতে পারে সেটাও আমাদের চাওয়া” ।
তিনি জোর দিয়ে বলেন ছয়দফা তার সম্পত্তি ছিল না – এটা মানুষের অধিকার। অতএব, তিনি এর যেকোন ধরনের  সংশোধনের অধিকার তার নেই।

“সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব” এর কথা উল্লেখ করে শেখ মুজিব  বলেন যে যারা এইসব কথা বলে তারা মূলত গুটিকয়েক মানুষের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ভুট্টোর বক্তব্যের উল্লেখ করে শেখ বলেন, ঐসব  শুধুমাত্র  আপত্তিকর ছিল না তা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কাও সৃষ্টি করেছে।  তিনি বলেন, জনাব ভুট্টোর ৮৩ সদস্যের  মত যদি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬০ জন সদস্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানাত তবে কি যে ঘটতে পারত তা তার জানার বাইরে।

 

শেখ মুজিব বলেন যে নির্বাচনের ফলাফল নস্যাৎ করার জন্য ষড়যন্ত্র চলছিল। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন গনতন্ত্রের প্রক্রিয়াকে যদি বাধাগ্রস্ত করা হয় তবে যে পরিণতি হবে তার জন্য তিনি দায়ী থাকবেন না।

 

 

<2.162.659>

 

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি

আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, তিনি দেশে একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা  প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নয় বরং বিবর্তনের মাধ্যমে।

অর্থনীতি হবে মানুষের জন্য যেন সাধারণ মানুষ তথা শ্রমিক, চাষি – এই ধরনের মানুষেরা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার পেতে পারে। তিনি এও বলেন যে পূর্ব পাকিস্তানে একচেটিয়া ও জোট-ব্যবসা চলবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোন ২২ পরিবার থাকবে না।
পাকিস্তান জাতীয় ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নব নির্বাচিত সদস্যদের সংবর্ধনা অনুস্থানে শেখ মুজিব প্রধান অতিথি ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের লনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যেখানে কূটনৈতিক কোরের সদস্যরা, কর্মকর্তা ও শহরের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

আওয়ামী লীগ প্রধান জনগনের কাছে  ক্ষমতা হস্তান্তর  বানচাল  করতে অব্যাহত ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, যদি এ বাধা অব্যাহত থাকে পরিণতির জন্য  তারাই দায়ী থাকবে। তিনি জোর দিয়ে ঘোষণা করেন “আমরা মরব কিন্তু কখনই আত্মসমর্পণ করব না” । শেখ মুজিব ঘোষণা দেন পাকিস্তান থাকবে এবং সেই সাথে থাকবে বাংলাদেশ, পাঞ্জাব. সিন্ধু, এনডব্লিউএফপি ও বেলুচিস্তান । আর যেটা বন্ধ হবে সেটা হচ্ছে মানুষের উপর মানুষের শোষণ।

 

বাংলাদেশের মানুষের উপর গত ২৩ বছর যাবত চলা শোষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাকালে শেখ মুজিব বলেন তারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী । তিনি বলেন সমাজতান্ত্রিক ধরনের অর্থনীতি ছাড়া ৫৫০০০ বর্গ মাইল এলাকায় ৭ কোটি মানুষের বসবাস সম্ভব নয়।

 

শোষণ সময়কাল.

শেখ মুজিব বলেন যে ২৩ বছরের স্বাধীনতা উত্তরকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য ছিল শোষণ , হতাশা ও বিষাদের যা চরম বঞ্চনায় রুপান্তরিত হয়েছে। তিনি বলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা “কায়েদ-ই-আজম” যদি বেঁচে থাকতেন তবে অবশ্যই বলতেন এমন পাকিস্তান তিনি চাননি। তিনি বলেন আরেকটু ভালো জীবনযাপনের আশায় স্বাধীনতা অর্জনের নিমিত্তে সংগ্রাম করে বিরাট বিসর্জন দিয়েছে। বিনিময়ে তারা এই কবছরে যেভাবে শোষিত হয়েছে তাতে তাদের দাঁড়ানোর শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে । তিনি প্রশ্ন রাখেন- কারা এই ক্রমাগত শোষণের জন্য দায়ী।

 

আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন যে পুরো প্রদেশ বহুমুখী সমস্যায় পরিপূর্ণ । বাংলাদেশের ৭০ লাখ মানুষ বেকার এবং খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে শহরাঞ্চলে গ্রামীণ জনগণ ক্রমাগত ধাবমান।  তিনি বলেন,  ২৩ বছরে বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ মানুষও  কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর চাকরির/সেবার ভেতরে আসেনি। তিনি জানান জনসংখ্যার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সেবার আওতায় বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। 

 

<2.162.660>

 

তবে তিনি বলেন, এসব রাতারাতি অর্জন সম্ভব নয়। তিনি বেকারত্ব দূরীকরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন “আমরা মানুষকে খাদ্যের অভাবে মারা যেতে দেব না।
শেখ মুজিব বলেন পশ্চিম পাকিস্তানে মোট বৈদেশিক মুদ্রার ৮০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে যদিও স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তান বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। তিনি বলেন ইচ্ছাকৃত ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের উদীয়মান তাঁত শিল্পকে বিপন্ন অবস্থার সম্মুখীন করা হয়েছে যার ফলে ২০ লাখ মানুষ কর্মহীনতার মুখোমুখি। আর এসবই করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে তৈরি পণ্যের সংরক্ষিত বাজার রক্ষার্থে। আই/আইসি রক্ষার নামে জাপান ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানিকৃত কাপড়ের দামের চাইতে ৬ গুন বেশি দামে বাংলাদেশের মানুষকে কিনতে হয়েছে।
তিনি বলেন ইচ্ছাকৃত ভুলে ভরা নীতির কারণে বাংলাদেশের মেরুদণ্ড পাটের রপ্তানি বাজার হারাতে হয়েছে।

 

চা পূর্ব পাকিস্তান থেকে রপ্তানি হত না যেহেতু এটি চোরাইপথে মধ্যপ্রাচ্যে বিক্রির নিজস্ব পথ খুঁজে পেয়েছিল। তিনি বলেন প্রদেশের  আরেকটি অর্থকরী ফসল তামাক সমস্যার মোকাবিলা করছিল।  তিনি আরও বলেন পশ্চিম পাকিস্তানের লবণ উৎপাদনকারীদের সুবিধা দিতে বাংলাদেশের লবণ উৎপাদনকারীদের উপর শুল্ক আরোপ করা হয় যার ফলে হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে।

 

জাতীয়করণ

শেখ মুজিব পুনরায় ঘোষণা করেন যে গরিব মানুষের কল্যাণে ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিসমূহ জাতীয়করণ করা হবে। তিনি বললেন ২২ পরিবারের এই ব্যাংকগুলোতে একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তারা টেলিফোনের মাধ্যমে এই ব্যাংকগুলোতে এলসি খুলতে পারে অথচ মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা এমন সুবিধা থেকে বঞ্ছিত থাকত। ওইসকল ধনপতিরা পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ জমা করে এবং পূর্ব পাকিস্তানে ওভারড্রাফট করে। এইসব পুঁজিপতিদের নির্দেশ করে তিনি বলেন তারা স্বল্প অর্থ নিয়ে বাংলাদেশে এসে এই সময়েই মিলিওনেয়ারে পরিণত হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন তারা কিভাবে এমন অর্থের মালিক হল। তিনি বলেন এইসব অর্থ শোষণের দ্বারা অর্জিত যেহেতু এগুলো স্বর্গ থেকে পড়েনি। শেখ মুজিব বলেন যখনই গরিব শ্রমিকেরা তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি তোলে তখনই তাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার নামে পিটান হয়।
ভারসাম্যহীনতা

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্যের বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন ৫৬ শতাংশ জনসংখ্যার পূর্ব পাকিস্তানের হাসপাতালে মাত্র ৬০০ টি শয্যা ছিল যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের হাসপাতালে ছিল ২৬০০০ শয্যা। তিনি প্রশ্ন রাখেন কারা এই অবস্থার জন্য দায়ী। কেন্দ্রীয় সরকারের এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত নয়।

 

শেখ মুজিব বলেন, ২৩ বছর যাবত মানুষকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান যেতে হয়েছে।

এমনকি সহজ ব্যবসা ও চাকরির বিষয়াদির জন্য পারমিট পেতে একজন ব্যক্তিকে করাচীতে যেতে হয়। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, তাকে  গণপরিষদের  অধিবেশনের জন্য করাচিতে তিন মাস থাকতে হয়েছিল ।

<2.162.661>

 

ব্যবসায়ীদের প্রতি আহবান 

ব্যবসায়ী সমাজের দিকে ফিরে তাকান। শেখ মুজিব বলেন অতীতে তারা এই বাংলাদেশের জনগণের- শ্রমিক, কৃষক, ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামের সময় জেগে উঠতে ও উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

তিনি আশা প্রকাশ করেন তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার  সংগ্রামে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হবে না। তিনি বলেন “নইলে আপনাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে কিংবা আপনারা দাসের ন্যায় বেঁচে থাকবেন”।

 

তিনি বাংলাদেশের মধ্যে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের  বলেন এটা ভুল ধারণা যে ৬ দফা আদায়ের পর তাদের আর ব্যবসা করার অনুমতি দেয়া হবে না। “ আপনারা এখানে ব্যবসা করেন, আমরা আপনাদের কখনো ছেড়ে যেতে বলব না। তবে দয়া করে মূলধন পাচার বন্ধ করেন।“
স্লোগানের ব্যাখ্যা দেয়া হল

শেখ মুজিব বলেন, “জয় বাংলা” (বাংলার বিজয়) রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। শেখ সাহেব বললেন যে স্লোগানটি হচ্ছে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্বাধীনতা। তিনি আরও বলেন স্লোগানটি হচ্ছে বেঁচে থাকার অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার স্লোগান ।