৭। ৯ এপ্রিল সম্পাদকীয়

Posted on Posted in 6

<৬,৭,১৪-১৫>

শিরোনামসংবাদপত্রতারিখ
সম্পাদকীয়জয় বাংলা ৯ম সংখ্যা৯ এপ্রিল, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

আমরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করিতেছি। অত্যাচার, অনাচার, অবিচার দূর করিয়া স্বাধীনভাবে শির ও স্বদেশের পতাকাকে সমুন্নত রাখিয়া বিশ্বের বুকে বিচরণ করিবার জন্যই লড়াই করিতেছি। আল্লহার মেহেরবাণীতে জয় আমাদের হইবেই। আমাদিগকে ঠেকাইবার শক্তি(এক আল্লাহ ছাড়া) আর কাহারও নাই।

যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যান্য নিরস্ত্র লোক বর্বরদের হাতে নিহত হইয়াছেন তাহাদের সকলের আত্মার শান্তির জন্য আমরা পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা জানাইতেছি।

গতকল্যকার বিশেষ সংখ্যায় বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হইয়াছে। প্রতি খবরই বিভিন্ন মহল হইতে সংগ্রহ করিয়া নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে যাচাইয়ের পরেই পত্রিকায় প্রকাশ করা হইয়াছে। যতগুলি ‘ফ্রন্টের’ উল্লেখ রহিয়াছে প্রতিটি অঞ্চলই ব্যাপকভাবে পরিদর্শন করা হইয়াছে। উহা ছাড়াও সমস্ত শহরও একাধিকবার চষিয়া বেড়ান হইয়াছে। একাজে দ্বিচক্রযানের পিছনে বসাইয়া ঘোরানোর এবং গাইডের কাজ করিবার জন্য জনাব আলমগীর হোসেন সাহেবকে এবং দ্বিচক্রযানের খোরাক এক গ্যালন পেট্রোল যোগাড় করিয়া দিবার জন্য মুক্তিযোদ্ধা দোস্ত পেস্তাকে ধন্যবাদ জানাইতেছি।

চুড়ান্ত বিজয় সমাসন্ন। এখন সকলকেই আরও বেশী হুশিয়ার থাকিতে হইবে। অনৈক্য, অরাজকতা, হিংসা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি কোন মতেই বৃদ্ধি পাইতে দেওয়া চলে না। পশ্চিমা বর্বরেরা যতখানি ক্ষতি করা সম্ভব করিয়াছে। কিন্তু আমরা যদি উপরি-উল্লিখিত পাপগুলিকে (আমরা ঐগুলিকে পাপ বলিয়া মনে করি) প্রশ্রয় দেই বা নির্মূল না করি তাহা হইলে যাহা অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহা হয়ত আমাদের নিজেদের হাতেই ধ্বংস হইবে। ঐক্য, শৃঙ্খলা ও শান্তির গুরুত্ব যুদ্ধবিশারদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, জনপ্রশাসনবিদ যাহাকেই জিজ্ঞাসা করুন না কেন একবাক্যে স্বীকার করিয়া নিবে। বিজয়ের মুহূর্তে এবং বিজয় পরবর্তী সময়ে ঐগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।

পশ্চিমা বর্বরদের অত্যাচারে সারা বাংলাদেশে এমন লোক পাওয়া দুষ্কর যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই। চুড়ান্ত বিজয়ের পরে পশ্চিমা বর্বরদের চিহ্ন একরকম থাকিবে না। এদিকে যাহারা উহাদের অত্যাচারে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে বা হইতেছে তাহাদের একটি অংশ ধীরে ধীরে হিংস্র হইয়া উঠিতেছে। এখনই ইহাকে বাধা না দিলে জয়ের শেষে হিংসাকে বাধা দেওয়া কাহারও পক্ষে সম্ভব হইবে না।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন- যুদ্ধের শেষে একরকম নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে। কিন্তু হিংসা শুধু থাকিবেই না-নিত্যনতুন বর্বরতার খবর কানে আসিবার (সমস্ত বর্বরতার খবর এখনও পাওয়া যায় নাই) সঙ্গে সঙ্গে উহা আরও বৃদ্ধি পাইবে। এই পুঞ্জীভূত হিংসা কোন দিকে ধাবিত হইবে? দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা তো ওঁৎ পাতিয়া রহিয়াছে-যেদিকে ইচ্ছা হিংসাকে দিক পরিবর্তন করাইবার ত্রুটি করিবে না। আমাদের তৃতীয় সংখ্যায় (১৮ই চৈত্র,১৩৭৭) আমরা ফরাসী বিপ্লবের উদাহরণ দিয়াছিলাম। ইতিহাস একেবারে অস্বীকার করা চলে না-যদি তাহাই চলিত তবে আর উহা নিয়া মাথা ঘামাইত না-আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা আন্দোলন ফরাসী বিপ্লব বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কাহিনী পড়িত না।

কাজেই আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট সকলেই দেশের মঙ্গল ও জনস্বার্থের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করিবেন।

আমরা একাধিকবার বলিয়াছি অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং উহাদিগকে ধ্বংস করা ধর্মীয় এবং নৈতিক কর্তব্য। হিংসার সঙ্গে উহার কোনই সম্পর্ক নাই।

মুক্ত অঞ্চলসমূহে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে যাহা করা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকলেই সেদিকে নজর দিবেন।

পশ্চিমা বর্বরদের বেতার কেন্দ্র কেহ ধরিবেন না। আমরাও তাহা শোনা অনেক পূর্বেই বাদ দিয়াছি। নিজস্ব একটি বেতার কেন্দ্র যতদিন আমাদের চালু না হইতেছে ততদিন বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানাদি শুনিতে পারেন। পূর্বের একটি সংখ্যায় আমরা উত্ত্রাঞ্চলে একটি বেতার কেন্দ্রের আবশ্যকীয়তার কথা উল্লেখ করিয়াছিলাম।