৭৬. ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানী ধবংসলীলা

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ তুষার শুভ্র

<৬, ৭৬, ৭১৭-৭১৮>

শিরোনামঃ পাকিস্তানী ধবংসলীলা

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ ভলিউম ১ নং ৩

তারিখঃ ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

.

পাকিস্তান হত্যাকান্ড

আমেরিকায় কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানের অধ্যাপক ড. ইকবাল আহমেদের “পাকিস্তানি কূটনীতিকের প্রতি চিঠি” এর কিছু অংশের উদ্ধৃতি নিচে হুবহু তুলে দেওয়া হল। চিঠিটি নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস এর ভলিউম ১৭ নাম্বার ৩ এ ২ সেপ্টম্বর ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

……ঘৃনার যোগ্য জনাব ভুট্টো যিনি গিরগিটির মত নিজের রাজনীতির রং পাল্টান, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিধিদের দ্বারা প্রসূত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্রের দম্ভ দেখিয়ে দেশটাকে গ্রিস ও স্পেনের মুসলিম ভার্সনে পরিনত করছে। যদিও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিবেচনা করে আমি দেশটিতে সামরিক আগ্রাসনের কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কিংবা নৈতিক কারন খুঁজে বের করতে পারি নি। বাঙ্গালীরা যে অর্থনৈতির বৈষম্য ও শোষণ, বঞ্চনার শিকার তা পশ্চিম পাকিস্তানের তুখোর রাজনীতিক ও অস্বীকার করতে পারবে না। রাজনৈতিকভাবে, দেশটিতে পশ্চিম পাকিস্তানের ১২ বছরের প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন বাঙ্গালিদের ক্ষমতার ক্ষুদ্র ব্যবহারের চর্চা থেকেও বঞ্চিত করেছে।

প্রাদেশিক সায়ত্তশাসনের জন্য আওয়ামীলীগের দাবির প্রতি সবার ঐকমত্য পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবহেলারই ফলাফল। অবিশ্বাস্য রকম অবহেলার চূড়ান্ত নমুনা প্রদর্শিত হয় নভেম্বরে সাইক্লোন দূর্গত মানুষদের প্রতি। সংসদীয় কোন সমযোতায় আসতে না পেরে,সেনাবাহিনী,পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করে। তাদের এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বিবর্ণ করে দেওয়া।

পাকিস্তানি আর্মিদের মনে হয়তোবা এই আশা ছিল যে তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আত্মসমর্পনের বাধ্য করতে পারবে। এটি এখন পরিষ্কার যে, সেনাবাহিনী সত্যিকারার্থে জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের আলোচনাটি দেশটি আক্রমণের প্রস্তুতির জন্য ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। আসাদ এবং লেইন-ও-নাহার এর মত পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া, পশ্চিম পাকিস্তানের সম্প্রতি ৮০০ ব্যক্তিকে বিচারবহির্ভূত ভাবে কারাবন্দী করে রাখা যাদের মধ্যে আছেন আফজাল বাঙ্গাস, মুক্তার রানা ও জি.এম. সৈয়দের মত নেতা, আবদুল্লাহ মালিক, শেখ আয়াজের মত বুদ্ধিজীবি, জি.এম শাহ্ এর মত শিক্ষাবিদ এবং লায়েলপুর ও শিয়ালকোটে সরকারের প্রতি ভিন্নমত পোষণকারীদের উপর নির্দয়ভাবে লাঠিচার্জ করা পূর্ব পাকিস্তানের সর্বগ্রাসী মনোভাবের পরিচয় বহন করে।  পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসনের যদি খুব শীঘ্রই ইতি ঘটানো না হয় তাহলে দূর্ভিক্ষ,মহামারী এবং ধারাবাহিক গনহত্যা মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের জীবনহানির কারন হবে। তাদের সামরিক আগ্রাসনে ইতিমধ্যে ২,৫০,০০০ নিরস্ত্র জনগনের মৃত্যুর জন্য দায়ী।

দ্রুত রিলিফের ব্যাবস্থা করেও আসন্ন বিপর্যয় এড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। শুধুমাত্র নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত আইনকে পুনরায় প্রয়োগই খাদ্যশস্য ও ওষুধকে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার প্রতিরোধ করতে পারে এবং শুধুমাত্র এটিই পারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক ত্রাণের সঠিক বিতরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে।

সর্বশেষ আমি এটা বলতে পারি যে, পূর্ব পাকিস্তানীরা স্বায়ত্বশাসন ও ভিন্নমত পোষণ করার অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত বেসামরিক সরকার ব্যাবস্থার পুনঃবহাল কখনই সম্ভব হবে না।

আমি বিশ্বাস করি, পশ্চিম পাকিস্তানীদের এখন একমাত্র করনীয় কাজটি হচ্ছে মার্শাল ল এখনি এবং বিনাশর্তে বাতিল করে দেওয়া, একটি ন্যাশনাল এসেম্বলিতে গৃহীত সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতে বিনাশর্তে রাজী হওয়া। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি পূর্ব ও পশ্চিম মিলিয়ে একটি রাজ্য এই বিরোধী হলেও শর্তটি মেনে নিতে হবে।

সেনাবাহিনীর হাস্যকর দাবীটি আমাদের বাদদিতে হবে যে তারা দেশটিতে হস্তক্ষেপ করেছে দেশের অখন্ডতা বজায় রাখার জন্য। এমন একটি দলের বিরুদ্ধে তারা এ দাবী করেছে যারা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত একমাত্র নির্বাচনে বিপুল আসনে জয়ী হয়েছে এবং জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য। সত্যিকারার্থে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শুধুমাত্র তাদের নিজেদের রাজ্যের সায়ত্বশাসনের দাবী জানিয়েছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জাতীয় পরিষদ আহবান করতে অস্বিকৃতি জানানোয় এবং ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণে পূর্ব পাকিস্তানিরা এখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের ঘোষণা দিয়েছে।

.

যেটি সবচেয়ে বিপজ্জনক তা হচ্ছে তার পশ্চিমা বন্ধু রাষ্ট্রগুলো, কংগ্রেসের গুরুত্বপুর্ণ ব্যাক্তি এবং বিশ্বব্যাংকের বিরোধিতা সত্ত্বেও আমেরিকান সরকার অস্ত্র দেওয়া ও অর্থনৈতিক সাহায্য অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শেখমুজিব ও তার দলের আনুগত্যের প্রতি এটি হুমকিস্বরূপ।

আমেরিকানরা এশিয়ার অন্য একটি অংশে মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত আরও একটি অপরাধের নীরব সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে।