২৯ অক্টোবর সম্পাদকীয়ঃ ইয়াহিয়ার কৌশল

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ ওমার ফাইলাসূফ

<৬, ৯০, ৭৩৮>

শিরোনামঃ সম্পাদকীয়ঃ ইয়াহিয়ার কৌশল

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ ভলিউম ১ নং ৯

তারিখঃ ২৯ অক্টোবর, ১৯৭১

.

ইয়াহিয়ার কৌশল

রাজনীতির মাঠের সবচেয়ে সরল কথাটাও মোড়ানো থাকে বিভ্রান্তির পুরু চাদরে। এ প্রসংগে বলা যায়, ভারতের বিরুদ্ধে ইয়াহিয়া সম্প্রতি যে সর্বাত্বক যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন, পরিস্থিতির বিচারে তা যতই সোজা সাপটা শোনাক, এর অন্তর্নিহিত অর্থ যথেষ্টই বিভ্রান্তিকর।

.

এখন যেহেতু যত দিন যাচ্ছে পূর্বে ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে, পশ্চিমের  জেনারেলদের শাসন কায়েম রাখার জন্য তুরুপের শেষ তাস হিসাবে ইয়াহিয়া খান সামনে এনেছেন “ভারত ভাঙ্গা”র স্লোগান।

.

ইয়াহিয়ার সর্বাত্বক যুদ্ধের ঘোষনাকে বিভ্রান্তিকর বলার কারণ হলো, বিগত যুদ্ধগুলিতে ভারতের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের ব্যার্থতার বিষয়ে তিনি ভালোভাবেই অবগত আছেন। কিন্তু প্রপাগান্ডা যে বিষয়টাকে আড়াল করে ফেলছে তা হলো এই ফাঁকা হুমকীর পেছনে ইয়াহিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ আদায় করে পুর্ব ও পশ্চিমে খানের শাসনের ভীত অটুট রাখা।

.

ইয়াহিয়া মূলত বিশ্বকে একটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা করছেন যে ভারত যদি অনুপ্রবেশকারী ও এজেন্টদের বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেয়, তিনি খুব সহজেই “আভ্যন্তরীণ বিষয়” ফয়সালা করে ঢাকায় একটি তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হবেন। তবে “কতিপয় ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী আর এজেন্ট” মিলে কিভাবে গোটা বাংলাদেশে কিভাবে এতো জটিল সমস্যা বাধিয়ে দিতে পারলো, তা এক আশ্চর্যের ব্যাপার বটে।অপরদিকে বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে বাঙ্গালী মুক্তি বাহিনীর নিয়ন্ত্রনে চলে আসছে এই সত্য কবুল করতে ইয়াহিয়া দৃশ্যতই লজ্জা বোধ করছেন। তবে, বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈশ্বিক স্বীকৃতি বিলম্বে আসার কারণ ইয়াহিয়ার বিদেশী সামরিক মিত্রদেশগুলো, যারা এখনি তাকে খরচের খাতায় ফেলে দিতে দ্বিধান্বিত্ত।

.

ইয়াহিয়া এখন দিন গুনছেন কবে তিনি দেশে একটা শাসনতন্ত্র তৈরি করে এসেম্বলির শূন্য আসনগুলো ভরাট করার কাজে মনোনিবেশ করতে পারবেন, সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় একটা বেসামরিক সরকার গঠন করার জন্য তিনি ইতোপুর্বে গোটা এসেম্বলির প্রায় অর্ধেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করেছেন। সম্ভবত উনার ধারনা হয়েছিলো তিনি সহজেই এই ভুয়া গনতন্ত্র দেখিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সহানুভূতি আদায় করে নিতে পারবেন।

.

কিন্তু মুক্তিবাহিনী তার সমস্ত হিসাব নিকাশের ছক পালটে দিয়েছে। এখন তারা ক্রমান্বয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের উপর আক্রমনের জোর বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধের মাঠে নাস্তানাবুদ ইয়াহিয়া এখন সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী প্রপাগান্ডা চালানোর কাজে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার এই প্রপাগান্ডার প্রভাব যে বাংলাদেশে বা বাইরের বিশ্বে পড়বে না এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায় সামরিক শাসন যে এর দ্বারা ন্যায্যতা পাবে না, তা বলাই বাহুল্য।