অপূর্ব

Posted on Posted in 2

• ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ের সুবাদে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প, ঘটনা, বীরশ্রেষ্ঠদের বীরত্বের গল্প, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ যুদ্ধের নানান বিষয় নিয়ে পড়া হয়েছিল। কিন্তু তখন ঘটনা বা বিষয়গুলো মুখস্থ করে গেলেও আত্মস্থ করা হয় নি। কখনো হৃদয় দিয়ে অনুভব করি নি। কিন্তু যখন একটু বড় হলাম, বুঝতে শুরু করলাম, তখন থেকেই নিজের ভেতরে কেমন যেন খুঁতখুঁত করতো। কিছু একটা করা দরকার।

তখন থেকেই প্রচন্ড রকমের আগ্রহ জন্মায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি। লাইব্রেরি গিয়ে, বন্ধুদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের বই সংগ্রহ করে পড়তাম। জানার চেষ্টা করতাম। এমনই সময় গণজাগরণের উত্তাল দিনগুলোতে জাগরিত হলো বাংলার অনলাইন। দিনরাত চলতো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি। তারা তিরিশ লক্ষ শহীদের ত্যাগের ইতিহাস মুহূর্তে মুছে দিয়ে তার নিজেদের মতো করেই ইতিহাসকে তৈরি করতে শুরু করলো। তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। তৃতীয় বিশ্বের এ যুগে ইন্টারনেটে একটা সার্চেই চলে আসে সবকিছু। কিন্তু, সেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা পাওয়া যায় খুবই কম। তাও কোন ঐতিহাসিক দলিল নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৫ খণ্ডের দলিলপত্র সহজে পাওয়া যায় না। প্রায় ১২০০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের প্রায় ৬০০০ পৃষ্ঠায় ইংরেজি। তাই অনেকেই গ্রন্থটি পড়ার বাসনা ছেড়ে দেন। ফলে, সঠিক ইতিহাস চর্চিত হয় না।

এমন সময় অনলাইনে পরিচয় ইঞ্জিনিয়ার লিও-র সাথে। হঠাৎ একদিন উনার পোস্টে দেখলাম, তিনি মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র নিয়ে কাজ করতে চান। জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে চান আমাদের গৌরবের ইতিহাস। ভেবে দেখলাম, আসলেই তো! মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদেরই পূর্ব পুরুষের ইতিহাস। এতো আমাদেরই বিজয়গাঁথার কথন। এটি জানা প্রতিটি বাঙালির অধিকার। তারা কেন জানবে না নিজের দেশের জন্মের ইতিহাস, তাদের শেকড়ের কথা? সাথে সাথেই ভাইয়াকে আমার কাজ করার আগ্রহের কথা জানালাম। ভাইয়া বললেন, সময় হলেই তিনি জানাবেন।
এর কিছুদিন পরই ভাইয়া একদিন ইনবক্স করলেন, অনুবাদে হেল্প করতে পারবো কি না। জিজ্ঞেস করলাম, কিসের অনুবাদ? ভাইয়া জানালেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের অনুবাদ। সাথে সাথেই আনন্দ আর প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেলো। হোক না সামান্য, তাও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু করতে পারাটা আমার কাছে সবসময়ই গৌরবের। তারপরই তাজকিয়া ইসাবা আপুর সাথে আমাকে ধরিয়ে দিলেন কাজ। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম, অনুবাদ সোজাই হবে মোটামুটি। কিন্তু করতে গিয়ে বুঝলাম না, কাজটা মোটেও সহজ না। মাথার ঘাম ছুটে যাচ্ছিলো। নিজের ব্যস্ততার জন্য টাইমলি সাবমিট করতে পারছিলাম না। তারপরও একবারের জন্যও তিনি রাগ করেন নি। বরং আমাকে উৎসাহ জুগিয়ে গেছেন। এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জানতে পারলাম অনেক কিছু। অনেক খুঁটিনাটি ঘটনা। নিজের মধ্যে অজান্তেই এক শিহরণ অনুভব করি। মনে হয় যেন, ফিরে গেছি সেই একাত্তরের দিনগুলোতে।
আমার খুব আফসোস হয়, কেন আমি একাত্তরে জন্মালাম না, কেন যুদ্ধে যেতে পারলাম না। তাই, আমি চেষ্টা করি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু একটা করার। দলিলপত্র নিয়ে কাজ আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে। পুরো দলিলপত্রকে ইউনিকোডে রূপান্তর করে আজ দলিলপত্রের অ্যাপ মানুষের মোবাইলে মোবাইলে। এখন মুক্তিযুদ্ধের কোন বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে নেটে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হয় না কিংবা বইয়ের আশায় বসে থাকতে হয় না। যে বিষয়ে জানতে চাই, সেটি লিখে সার্চ দিলেই মুহূর্তে চোখের সামনে হাজির হচ্ছে তার পুরো ইতিহাস। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আজ তরুণ প্রজন্মের হাতে উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। এখন, সহজেই সবাই জানতে পারবে দেশের ইতিহাস। আর কোন তথ্য বিকৃতি কিংবা মিথ্যাচার করার সুযোগ নেই। একাত্তরকে জেনে, একাত্তরের আদর্শে উজ্জ্বীবিত হয়ে এগিয়ে যাবে আমার সোনার বাংলাদেশ। জয় বাংলা।