apd1

আলামিন সরকার

স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র। ১৫ খন্ডের বিশাল এক সংকলন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিল। অনলাইনে এই দলিলের পিডিএফ ভার্সন আছে। ইউনিকোড ভার্সন নেই। যার ফলে দলিলের অন্তর্ভুক্ত কোনো তথ্য পাওয়া খুবই জটিল, এক কথায় দুঃসাধ্যই বলা চলে। কারণ এই বই থেকে আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কোনো তথ্য জানতে হলে, হয় বইটির হার্ড-কপি কিনতে হবে নয়তো ৬০ এমবি’র পিডিএফ ডাউনলোড করে নিতে হবে। হার্ড-কপির দামটা শুনবেন না? মাত্র পনের হাজার টাকা মাত্র! তারপরেও না হয় কিনলাম বা ৬০ এমবি পিডিএফ নামালাম। এতেই তৃপ্ত হয়ে যাবেন না প্লিজ। এখন ১৫ হাজার পৃষ্ঠা ঘেঁটে খুঁজতে হবে দলিলের কোথায় কোথায় তাজউদ্দিন সম্পর্কে তথ্য আছে। পারবেন? মনে করি না অহরহ এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। অথচ শুধু সার্চ ইঞ্জিনে যদি লিখে দেই “তাজউদ্দিন” আর অমনিতেই পাওয়া যায় সব তথ্য তাহলে তো আর কথাই থাকে না! একটি জাতির অস্তিত্বের ইতিহাস, জন্মের ইতিহাস পরে থাকবে হাজার হাজার টাকার বেড়াজালে? এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের রক্তস্নাত বীরত্বের ইতিহাস ছড়িয়ে পড়বে প্রাণ থেকে প্রাণে, এটাই চাই। বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জেনে, বুকে ধারণ করে আগামীর পথ চলবে প্রতিটা বাঙালি। এর জন্য আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। এসেছেও তরুণ প্রজন্ম। একঝাঁক তরুন একত্র হয়েছি একই উদ্দেশ্য নিয়ে। উদ্দেশ্য হলো- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই হবে বাঙ্গালীর একমাত্র পরিচয়।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের দলিল (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র) ইউনিকোড ভার্সনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছি। ইউনিকোডে রূপান্তরের কাজ চলছে। ইউনিকোড করার পরে একে একে অনলাইনে উন্মুক্ত করা হবে পুরোটা দলিল। তখন যে কোন তথ্য যে কোন সময় মানুষের নাগালেই থাকবে। চাইলেই খুজে পাওয়া যাবে, জানা যাবে। অলরেডি অষ্টম খণ্ডের কাজ শেষে হয়ে গিয়েছে। একটু বেশি সময় নিলেও নবম খণ্ডের কাজ শেষ হলো আজ।

কিভাবে শেষ হলো নবম খণ্ড? কাজ যারা করেছে, তাদের কথাও বলা জরুরী। এক একটা খণ্ড উন্মুক্ত করার পিছনেও তৈরী হয় এক একটা সুন্দর গল্প। হাসি আনন্দ উৎসাহের এক অপূর্ব সংমিশ্রণে জড়ানো থাকে এই গল্পটা। আমি নবম খণ্ড নিয়ে কাজ করেছি, তাই নবম খণ্ডের কথাই বলি।

প্রথমেই আসবে শিমুর নাম। চাকুরিজীবি। সারাদিন ব্যস্ত থাকে। রাতে ছাড়া তাকে একবারও নেটে পাই নি। অথচ এই বিজি মেয়েটা পালন করে গেছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সবাই দলিল কম্পাইল করে আমার কাছে দিলে আমি একবার চেক দিয়ে শিমুর কাছে পাঠাতাম। সে চেক দিয়ে সিরিয়াল মোতাবেক দলিলগুলো সাজাতো এই ফাইলে। অনেক সময় সে রাত তিনটা বাজেও মেসেজ দিয়ে কোন তথ্য দিত বা নিত। অবিশ্বাস্য!

তামিম ভাই একজন ডেন্টিস্ট, চীনে অধ্যয়নরত। তার ব্যস্ততার কথা এমনিতেই অনুমান করা যায়। বিদেশে থাকলে কেউ অবসরে থাকে না। আমি মোবাইলে কাজ করি, কাজ করে কুলানো না গেলে কিছু দলিল তামিম ভাইকে দিয়ে বলতাম, ভাই- চেক দিয়ে দিন। অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজের দ্বায়িত্বও ছিল তার। সানন্দে করতো। এই কাজটা ফরহাদও করতো। ফরহাদ লন্ডনে থাকে। পড়ালেখার পাশাপাশি পার্টটাইম জব। সে কতটা ব্যস্ত জীবন পার করে, তা ভাষায় প্রকাশ যাবে না। এদের সবার কাছ সময় নিঃসন্দেহে অমূল্য।

অথৈ’কে সবাই চিনবেন না। আমিও চিনতাম না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বেলায় আমরা একই পথে হেটেছি, এখনো হাটছি। মিষ্টি একটা মেয়ে। যা বলবে, ঠিক ঠিক করে পাঠিয়ে দিবে। পরীক্ষা, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন থাকে প্রায়ই। তখন বলে, ভাইয়া পরীক্ষা শেষ হলেই আবার কাজ করবো। কী যে উৎসাহ! গর্ব নিয়ে কাজ করে সবাই! সমীরণের কথাই ধরুন! মাত্র পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে ছেলেটা। বড় ভাই সজীবের কাছে বায়না ধরেছে সে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করবেই। সজীবও আমাদের সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই পিচ্চিটার আগ্রহ দেখে আমি অবাক হয়েছি। কারো সামর্থ থাকলে মুক্তিযুদ্ধের জন্য এমন আবেগের গভীরতা মেপে যান পারলে! জানি পারবেন না। এদিকে তানিয়া আপা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। ৩০ পৃষ্ঠার একটি কাজ দুইদিনে করতে হবে, তানিয়া আপাকে বললাম, আপনি ২০ পাতা করবেন, আর আমি দশ। নিঃসঙ্কোচে মেনে নিলেন। অথচ আমি যেদিন কাজের কথা বলেছি, তার পরের দিনই সানি ভাইয়ের জন্মদিন ছিল! উনি সারাদিন ব্যস্ত থাকবেন স্বাভাবিক। একটা দিন মাত্র হাতে ছিলো। কতটা দেশপ্রেম থাকলে মানুষ এমন হতে পারে বলতে পারেন?

ওমর ফারুক শুভ। প্রবাসী। মোবাইলে রিডার লোড করতে কতই না যন্ত্রণা গিয়েছে! আবার দলিলের পিডিএফ লোড হয় না, কত যন্ত্রণা! তবুও কাজ করছে। কারণ কাজটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে।

সৈয়দা অনন্যা রহমান, সংস্কৃতিমনা ও পদস্থ এনজিও কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধের বেলায় তারুণ্যের অগ্রপথিক হয়ে আমাদের সাথে পথ চলছেন। এই কাজ করতে পেরে খুবই গর্ববোধ করেন। চন্দন ‘অবহেলিত নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে আমরা’ নামক সংগঠনে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিহাস নিয়েও কাজ করছেন ক্লান্তিহীন। শ্রাবণ চৌধুরী দিলখোলা রসিক মানুষ। মুক্তিযুদ্ধকে বুকে ধারণ করে চলেন। নীলা ভাবী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তার স্বামী শামীম ভাই। দু’জনেই আছেন আমাদের সাথে। বড় দলিলগুলো করেছেন এই দম্পতি। শামীম ভাই বড় পর্যায়ে কাজকর্ম করে থাকেন। তারপরেও মুক্তিযুদ্ধের দলিল টাইপ করতে কম্পিউটারে বসে পড়েন সব অবসাদ ছুঁড়ে ফেলে। নীলা ভাবী, আপনার বাবাকে আমাদের পক্ষ থেকে সালাম জানাই শত কোটি।

দীপংকর ঘোষ দ্বীপ, ইশতিয়াক আহমেদ টিপু, রুবেল শংকর, রকিবুল হাসান জিহান কাজ করছেন দেশপ্রেমের তাগিদে। সাইফুল ইসলাম, তার পরীক্ষা ছিলো ২৯শে অক্টোবর থেকে, সজীবের পরীক্ষা ছিলো ১১ই নভেম্বর, মেহেদীর পরীক্ষা ছিলো ১ নভেম্বর থেকে, জারিফেরও পরীক্ষা ছিলো। পরীক্ষা শেষে সবাই ফিরেছে। কারণ এরা থামবে না। পরীক্ষার পর থেকে আবার কম্পাইল শুরু করেছে। বিদ্যুৎ মনোরঞ্জন দে- খুবই অভিমানী মানুষ। নিজের সন্তানের জন্য একটা নিরাপদ দেশ রেখে যেতে পারছে না বলে এক বুক কষ্ট তাঁর। আজও কেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমী ছেড়ে চলে যেতে হয় ধর্মীয় উন্মাদনার ফলে! কষ্ট নিয়েও তবু সব কিছুকে তুচ্ছ করে তিনি আমাদের সাথে আছেন। কাজ করছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে। আমরা কথা দিতে পারি, তরুণ প্রজন্ম এই দেশ বাঙালির দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে।

ফকরুজ্জামান সায়েম দারুণ এবং খুব দ্রুত কাজ করে। তাকে বাহবা দিতেই হয়। রুবেল শংকর প্রতিভাবান নাট্যকর্মী। কাজে গতি আছে। নাজমুস সাকিব আছে। এটাই আমাদের শেষ কাজ না। ৩০ লক্ষ শহীদের দেশের ইতিহাস নিয়ে যুগ যুগ ধরে কাজ করলেও শেষ হবে না। কত নদী চোখের জল, কত আর্তচিৎকার, কত বেদনা, কত সংগ্রামের এই ইতিহাস আমাদের!! কাজ চলবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

দলিলে অনেক ইংলিশ সাক্ষাৎকার আছে। অনেকেই অনুবাদের রিস্ক নিতে চায় না। আমিও না। আমি জানি অনুবাদ করতে গেলে আমার সাথে অনেকের বাদানুবাদ হয়ে যাবে। তাই এসবের দায়িত্ব পড়েছে আমার ছোট ভাই মুহসিন সরকার এবং সেই সাথে অভিজিতের উপর। দুজনেই ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। তাদের জন্য শুভকামনা। সজীব সাহা দারুন আবেগে মুক্তিযুদ্ধের কাজ করে। টাইপ করা যে খুব একটা সহজ কাজ না তা বুঝি আমি আর বুঝে জেসিকা গুলশান তোড়া। তাকে স্ক্রীনশট পাঠালে সেটা আগে খাতায় লিখে পরে মোবাইলে টাইপ করে। আশ্চর্য মনে হয় না? তাকে প্রথমে বলতাম তিন পাতা কিন্তু দিতাম পাঁচ পাতা। তবুও কখনো পিছু হটে নি। অথচ সেও একটা চাকরি করে। ছুটির দিনে যায় নুহাশপল্লী বা অন্য কোথাও। সময় নাই তবুও কাজ থেকে সরে যায় নি। এমন আরো অনেকে আছেন, যারা অন্যান্য খণ্ডে কাজ করছেন।

কত মিসটেক করেছি কাজ করতে গিয়ে! কাজ শেষ করতে পারছিলাম না। তখন দেখা গেলো একই কাজ দু’জনকে দিয়েছি, যখন কাজ হাতে এসেছে, তখন দেখা গেলো একই কাজ দুজনে করেছে। মেজাজটা কেমন লাগতো!! শেষের দিকে এসে কাজ যখন এগুচ্ছিলো না তখন এগিয়ে আসলো পলাশ ভাই, ফয়সাল ভাই, নোবেল হিমুরা ভাই, রাজু ভাই এমনকি লিও নিজেও। এই যে একসাথে কাজ করছি সবাই, আমরা কারা? কি আমাদের পরিচয়? আমরা কিভাবে এক হলাম? এখানে ভিন্ন রুচী, ধর্ম-বর্ণের মানুষ আমরা, তবুও এক কাতারে এসেছি কারণ দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের এক করেছে। আর কিছুই না।

-আমাদের গন্তব্য কোথায়?
-কে জানে 