ফারজানা আক্তার মুনিয়া

Posted on Posted in 2

জন্মসূত্রে মুক্তিযুদ্ধের সাথে আত্নীয়তা। দেখি নি কখনও শুনেছি অনেক। বাবার কাছে খুব ছোট থাকতে প্রথম শুনেছি যুদ্ধের কথা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা ছিল খুব ভাসা ভাসা। রাজার দেশ বাইরের শত্রুরা দখল করতে আসলে কিভাবে রাজা তার সৈন্যদের নিয়ে শত্রুদের যুদ্ধে হারালো, সেই গল্পছলে মুক্তিযুদ্ধের কথা প্রথম শুনি। আক্ষরিক অর্থে “মুক্তিযুদ্ধ “শব্দটার সাথে প্রথম পরিচয় পাঠ্যবইয়ে। কিন্তু তখনও সেই পরিচয় ছিল খুব সাদামাটা। শুধু কিছু সংখ্যা, সাল, শহীদের নামের মধ্যে সেই জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের আসল রূপ দেখতে পাই ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে। তৎকালীন নবনির্বাচিত সরকার খুব ঘটা করে তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্র বা রেকর্ড করা ভিডিওগুলো দেখাতো। আমার মুখস্ত করা সংখ্যাগুলোর বাহ্যিক রূপ তখন দেখার সুযোগ পেলাম। যুদ্ধ মানেই যে শুধু রাজা-সৈন্যদের যুদ্ধ ছিল না, তার পিছনেও যে যুদ্ধের কতো ভয়াবহ রূপ ছিলো, তখন প্রথম টের পেলাম। ওই বয়সটায় মানুষের বোধের ভিত্তি তৈরি হয়। আর ঠিক তখনই দেখা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রগুলো পাকাপাকিভাবে মনে আসন দখল করে নেয়।
আরো দুই এক বছর পরেই সুযোগ পাই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি”, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের “হাঙর নদী গ্রেনেড”, প্রিয় লেখক হূমায়ন আহমেদের “১৯৭১”, ” আগুনের পরশমনি”সহ বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিচারণ পড়ার। যার ফলাফল দাঁড়ায় এই যে, যেই যুদ্ধ আমি চোখে দেখি নি সেই যুদ্ধ, সেই সময়, সেই যোদ্ধা-শহীদদের প্রতি অন্ধভক্তি, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা খুব সহজেই মনে গেঁথে যায়। এরপর স্কুল কলেজ ভার্সিটির গণ্ডী যত পেরিয়েছি, মুক্তিযুদ্ধকে ততো ভালোভাবে জেনেছি। তবে এটাও স্বীকার করি যে, তখন মুক্তিযুদ্ধকে জানার পথ খুব মসৃণ ছিল না। দলিলপত্র তো অনেক দূরের কথা, অনেক তথ্যই একেক জায়গায় একেকভাবে উপস্থাপিত হতে দেখেছি।
ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ব্লগে কিংবা সাইটেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনেক লেখা পড়া হয়েছে। তবে সমস্যা একটাই, তথ্যগুলো নির্ভুল কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ ছিল না।

এরমধ্যে ২০১৫ সালে ফেসবুকে আমিনুল হক পলাশ ভাইয়ের একটা পোস্টের মাধ্যমে যুদ্ধদলিল প্রকল্পের সাথে পরিচয়। রেগুলার ফলোয়ার হিসেবে এখনো আছি এই প্রজেক্টের সাথে। এই প্রজেক্টের প্রথম কয়েকটা পোস্ট পড়েই বুঝেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কত তথ্য অজানা ছিল। যুদ্ধের সময়কাল ১৯৭১ হলেও সূচনাটাতো বহু আগেই হয়েছিল। কত ঘটন-অঘটনের মধ্যে দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তা এতদিন পরে এসে হয়তো পুরোপুরি বুঝলাম। পাশাপাশি প্রকল্প থেকে ফেসবুকে স্বেচ্ছাসেবক আহ্বান করা হলো। লুফে নিলাম প্রস্তাবটি। শুরু করলাম দলিল কম্পাইলেশনের কাজ। যখন যতটুকু কাজ করেছি, প্রতিটা লাইন মাথায় গেথে আছে। পাকিস্তানীদের একতরফা আইনি শাসন, শোষণ সব মনে হয় সামনাসামনিই দেখতে পাচ্ছিলাম। নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার প্রয়োজন ও সার্থকতা টের পেলাম।

সবচাইতে বড় স্বস্তির জায়গা হচ্ছে যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। খুব সহজেই তথ্যগুলো হাতের কাছে পাওয়ার ব্যবস্থা করে যাচ্ছে এই প্রোজেক্ট। এমন একটা মহৎ কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে যারা জড়িত, তারা নিঃসন্দেহে সাধুবাদের দাবিদার।