3

সালাউদ্দিন ফেরদৌস

দেশপ্রেম ব্যাপারটা বুঝতে পারি না। ভালবাসাটা কীভাবে অনুভব করবো, যদি পুরো দেশটাকে একদম নিজের ভেতরে না নিতে পারি? এটা তো অনেকটা মোড়ের দোকানদারের প্রতি অভ্যস্ততাজনিত স্নেহ-বোধ, বাসা পাল্টানোর সময় প্রিয় টেবিলের কাঠের চিড়টার প্রতিও সজল অনুরাগ, অচেনা শহরে কারো মুখে নিজ গ্রামের বুলি শুনে চমকে ওঠার মতই, কিংবা স্টেশনে পুটলিসমেত গরিব বৃদ্ধাকে দেখে কাতর বোধ করার মতই একটা অসচেতন অধিকারবোধ। মনে হয়। কিন্তু আবার, বাংলাদেশ শব্দটা কোথাও লেখা দেখতে— কী বাংলায় কী ইংরেজিতে— ভালো লাগে; নিজের সৃষ্টি করা বর্ণমালা মনে হয়; ‘বাংলাদেশ’ ধ্বনিটুকু শুনতে মনে হয় যে এই শব্দটা আর কারো না, কেবল আমারই, আমার জন্যই; বিসিএস ওয়ার্ল্ড ম্যাপে বাংলাদেশের চার হাতপা ছড়ানো ভূখণ্ডটুকু দেখলে সাদা মাটির উঠান আর সবুজ ডাঙ্গাই মনে হয়; ক্রিকেটে জিতলে মুহূর্তে অসচেতনভাবেই চোখে পানি চলে আসে; এমনকি ‘নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্তিতেও মনে হয় যে আমরা আছি;— সম্ভবত এগুলোই ভালবাসা। অথচ আমরা অধিকাংশই তো আত্মপরিচয়সংকটে ভোগা, নেহায়েত স্বার্থপর, ঝামেলা-এড়ানো, প্রতিবাদহীন, বৃহত্তর চেতনারহিত এক-একটা ব্যক্তিমানুষ। তবুও দেশকে কেন ভালো লাগে আমাদের? কখনো কখনো দেশের নামে চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়? খুব অদ্ভুত! মুক্তিযুদ্ধের দলিল অনুবাদের কথা এইভাবে বলি, ‘দেশের কোনো একটা কাজ করছি’— এমন একটা উর্বর অনুভূতি চাপিয়ে নিয়ে নিজেকে প্রবোধ দেওয়া আসলে কঠিন, তবে ভালো লেগেছে অংশগ্রহণ করে। কত রাতের পর রাত-ই ত অ্যাসাইনমেন্টের আর লেট সাবমিশনের খপ্পরে কাটিয়েছি, নেহায়েত সিনেমা দেখে, অলস আড্ডায় আর শুয়ে শুয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে কাটিয়েছি, সেখানে দশ-বারো ঘন্টা ‘কোয়ালিটি টাইম’ খুব বেশি চাহিদা না আসলে। তবে সামগ্রিক অনুবাদের মান, প্রক্রিয়া আরো উন্নত করা যায় যদি অনুবাদকদের নিয়ে, পারতপক্ষে অনলাইনেই, কোনো ওয়ার্কশপ-ধরণের আয়োজন করতে পারি আমরা, যেখানে হয়ত সবার কাছে একটা রূপরেখা দিয়ে ফেলা গেল যে আমাদের অনুবাদের সুরটা, পদ্ধতিটা, উদ্দেশ্যটা, এমনকি বানানরীতির মত সূক্ষ্ণ ব্যাপারগুলোও কেমন হবে। এর সুবাদে পরবর্তী সময়ে সম্পাদকদের জন্য কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। মাসের কোনো একটা দিন আমরা অভিজ্ঞতা বিনিময় ধরণের কিছুও করতে পারি, যেখানে হয়ত চমকপ্রদ কিছু উদ্ভাবিত হল। এই কামনাই রইলো।