Yahya’a Approaching Doom

Posted on Posted in 5
ইয়াহিয়ার আসন্ন সর্বনাশ

যে ব্যাক্তি এক কানে শোনে না সে রাস্তার এক পাশ দিয়ে হাঁটে, কিন্তু যখন সে কোন কানেই শোনে না তখন সে হাঁটে রাস্তার মাঝখান দিয়ে। নির্লজ্জতার ব্যাপারে এটা একটা বাঙালি প্রবাদ। ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদসমর্থক পত্রিকা ডেইলি মেইলে প্রকাশিত ইয়াহিয়ার সর্বশেষ সাক্ষাতকারে তার গতিপ্রকৃতি এই প্রবাদটির সাথেই খাপে খাপ খায়। যখন সমগ্র বিশ্ব জানত যে মুজিবের সাথে সংলাপের মিথ্যা নাটকের মাধ্যমে ইয়াহিয়া ও তার সঙ্গীসাথীরা বাংলাদেশের ওপর গণহত্যার দুই বছরের পুরনো পরিকল্পনা সাজাচ্ছে,  এই জানোয়ারটা এখনো বলে যাচ্ছে যে, শেখ মুজিবের শুধুমাত্র আভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তিনি তা ভঙ্গ করেছেন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করে তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অজ্ঞতা এরকম অশোধনীয় জড়বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের জন্য শুধুই স্বর্গবাস। এই ব্যাক্তি মনে হয় না নিজের ভ্রান্ত ধারণা আর দাবিগুলোকেও আদৌ স্বীকার করবে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবাঙালির মৃত্যুর খবরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ২৫দিন ব্যাপী শান্তিময়, অসহিংস, অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়ার একমাত্র ঘটনা ছিলোনা। শুধুমাত্র যে সংখ্যকক পশ্চিম পাকিস্তানী ঢাকা থেকে প্রচুর পরিমাণে নগদ অর্থ ও সোনাদানা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো, ছাত্র সেচ্ছাসেবীরা মাঝপথে তাদেরকে পাকড়াও করে। যদিও সেনাবাহিনী অগ্নিকান্ড, হত্যা এবং আঘাতের মাধ্যমে তাদেরকে খেপিয়ে তুলছিলো উপরন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিদের মৃত্যুর আর কোন ঘটনা ছিলো না। বরং পরিস্থিতির চাপা উত্তেজনা দেখে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। . দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে স্বল্পদেখা শরণার্থীর একটি শাখা এদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে সবসময় আবদ্ধ ছিলো। এই শাখাই ইয়াহিয়ার খুনিদের সম্পূর্ণভাবে সহায়তা করেছিলো ইতোমধ্যে ২৫শে মার্চ তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রথমে তাদের প্রশিক্ষিত করে এবং অস্ত্র সরবরাহ করে। তারপর সামরিক বাহিনীর পূর্ণ তত্ত্বাবধানে তারা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম , খুলনা, রংপুর, সৈয়দপুর, ঈশ্বরদী এবং আরো বহু স্থানে বাঙালী বিরোধী দাঙ্গা শুরু করে। শতাধিক নিরস্ত্র, নিরপরাধ বাঙালীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এবং তাদের ঘরবাড়ি বিষয়সম্পত্তি লুন্ঠিত হয়। এমনকি নারী ও শিশুদেরকেও ছেড়ে দেয়া হয়নি। এই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড মনে করিয়ে দেয় সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার কথা যা ২০/২৫ বছর আগে আমাদের প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য হয়েছিলো। তৎসত্ত্বেও বাঙালী সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছে। মুক্তিবাহিনী কর্তৃক উদ্ধারকৃত অঞ্চলে ববসবাসকারী উর্দুভাষী জনসমষ্টির নিরাপত্তা বিধান করেন আবেগপ্রবণ মুক্তিবাহিনীর কমাণ্ডার। তা সত্ত্বেও মুক্তিবাহিনী সরিয়ে নেয়ার পর দুর্ভাগ্যক্রমে এই মানুষগুলোর একটা দল পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী রূপে কাজ করে এবং বাঙালী হত্যাকাণ্ড এ অংশগ্রহণ করে। . আমি যতদূর সম্ভব একটি অবাঙালি শাখার কথাই উল্লেখ করেছি। কারণ বাংলাদেশে উর্দুভাষী আরো একটি দলের অস্তিত্ব ছিলো যারা শেখ মুজিবের প্রতিশ্রুতির উপপর বিশ্বাসী ছিলো যে তাদের সাথে বাঙালীর মতই আচরণ করা হবে। এই প্রতিশ্রুতি তাদেরকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য একটি ভূমি খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলো। তা সত্ত্বেও তাদের পাকবাহিনীর প্রলোভন সইতে হয়েছিলো। ঔপনিবেশিক পাকবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিলো জনসংখ্যার একাংশকে অন্য অংশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা ; কৌশলটি তারা তাদের পূর্ববর্তী নিয়ন্ত্রণকারীদের কাছ থেকে আয়ত্ত করেছিলো।
ভারতীয় মুসলমানের একটি দল তখনো পাকিস্তানিদের জন্য স্মৃতিবিধুর মমত্ত্ব বোধ করতো – অথচ এই রাষ্ট্রের জন্য চল্লিশের দশকে আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিলো একটিমাত্র আশায়; এটি হয়তো ভারতীয় মুসলমানদের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উৎকর্ষতা সাধন করবে।কিন্তু সেই প্রত্যাশা অচিরেই নষ্ট হয়ে গেল। একদল অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং নিজেদের স্বার্থে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল উপায়ে নির্মমভাবে জনগণকে শোষণ করতে থাকে।. অকস্মাৎ বাংলার মানুষ উপলব্ধি করতে পারলো যে শোষকদের সমধর্মাবলবী হয়েও তারা আদৌ কোন সাহায্য পায়না বরং এটিই ছিলো প্রধান প্রতিবন্ধকতা। কারণ কেউ যদি শোষণের বিরোধিতা করতো তবে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ইসলাম এবং তথাকথিত অখণ্ডতার দোহাই দিয়ে তাদের উপর আক্রমণ চালাতো। মানুষ তাদের প্রতারণা, বিভ্রান্তি অথবা ছলনা দমন করতে চাইলে তারা পূর্ণ শক্তি নিয়ে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালাতো ।কিভাবে মানুষ সজ্ঞানে এমন একটি কলুষিত চক্রের পক্ষ নিতো! এমনকি যারা তাদের সাহায্য করতো তারা বুঝতেই পারতোনা যে তারা কেবলমাত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তানি জান্তা নিজেদের আসল চেহারা লুকিয়ে রেখে সর্বাত্মক ভাবে চেষ্টা করেছিলো বিষয়টাকে হিন্দু-মুসলিম তথা ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার একটি সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করতে। কিন্তু বাস্তবে যে লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র নারী,পুরুষ ও শিশুকে তারা হত্যা করেছিলো তাদের একটি বড় অংশ ছিলো ধর্মপ্রাণ মুসলমান। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ভারতীয় মুসলমান কি করে ‘জিহাদ’ আখ্যা দিয়ে পারে! এমনকি একে ইসলাম রক্ষার কবচ হিসেবে সফল পদক্ষেপ কিংবা পাকিস্তানকে সম্ভাব্য ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করে কিভাবে!

তা সত্ত্বেও সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিলো ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখার লক্ষ্যে । রাষ্ট্রপতি নিক্সনের পররাষ্ট্রনীতি ইন্দো- সোভিয়েত চুক্তিসই এবং জাতিসংঘে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অন্তর্ভুক্তি এবং  যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট চিয়াং কাই শেকের তাইওয়ান হতে বিতাড়ন প্রভৃতির ফলে একটি বড়সড় ধাক্কা খায় । রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে , পাকিস্তানকে সহায়তা করতে অস্ত্র পাঠানোর উপর এই ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত নিষেধাজ্ঞাটি মূলত রাষ্ট্রপতি নিক্সনের ডেমোক্রেটদের কাছে হারানো অঞ্চলের অন্তত কিছু অংশ হলেও ফিরে পাবার একটি প্রচেষ্টা মাত্র ।

এই ঘোষণাটি অবশ্য বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের কাছে সতর্ক বিবেচনা গ্রহণ করবে। কেউই এটা লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হবে না যে ভবিষ্যৎ অস্ত্র সরবরাহের উপরকার এই নিষেধাজ্ঞা ইয়াহিয়া জান্তার সম্মতিতেই আরোপিত হয়েছে । উপরন্ত ,এরকম ভাবার কোন কারণ নেই যে বাংলাদেশের এই শোকাবহ ঘটনাটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির কোনোরূপ পরিবর্তন হয়েছে । ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, রাষ্ট্রপতি নিক্সন ইসলামাবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াটা বেঁছে নিলেন এবং ইয়াহাইয়া ও তার ঘাতক দলকে বাংলাদেশে এই নিষ্ঠুর হত্যালীলা বন্ধের জন্য কোন প্রকার চাপ প্রয়োগের চিন্তা বাতিল করে দিলেন । এই বিষয়টি আবারও ওই ধারণাটিকেই জোরালো করে যে হয়তোবা এই সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়তোবা বাংলাদেশের জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল তার সাথে একদমই সম্পর্কিত না – বরঞ্চ এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের ঘরোয়া রাজনীতির উদ্দেশ্যে নেওয়া ।

সত্যি এটাই যে বিশেষ একটা সময়ে ইয়াহিয়া স্বেচ্ছায় বিরতি দিতে সম্মত হয়, যখন সে বাংলাদেশে তার নিশ্চিত পরাজয়ের সম্মুখীন হবার সন্দেহর ও জন্ম দেয়। হতেও পারে যে একই সাহায্য পরোক্ষ আরেকটি চ্যানেল থেকে আসবে এই প্রতি শ্রুতির বিনিময়ে, তিনি সরাসরি সাহায্য বন্ধ করার জন্য সম্মত হয়েছিলেন? পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অবাধে ইউ এস এর অস্ত্র সরবরাহের জন্য জর্ডান, তুর্কি, ইরান বিকল্প রাস্তা খুলে দিয়ে দিয়ে সাহায্য করতে পারে যাতে নিক্সন প্রশাষনের নিকট বাধ্য গত ভাবমুর্তি অক্ষুন্ন থাকে। পরবর্তিতে এই সব দেশ গুলো  ইয়াহিয়ার ঘনিষ্ঠ দালাল হিসেবে বাংলাদেশের লোকদের বিরুদ্ধে গনহত্যার যুদ্ধে অবস্থান নেয়। রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয় যে, গত ছয় মাসে প্রচুর পরিমানে সামরিক হার্ডওয়্যার ও জ্বালানী এসেছে তেহরান ও আংকারার হতে ইয়াহিয়ার কাছে। কোন উপায় আছে কি এই সব দেশের মাধ্যমে ইউ এস এর বাক্সভর্তি অস্ত্র  পরিবহন বন্ধ করার উপায় আছে কি ? ইউ এস কংগ্রেস বেশ সতর্কতা প্রদর্শন করেছে তাদের উপর,বাংলাদেশের প্রতি প্রশাষনের এই নিষ্ঠুর নীতি। সম্ভবত তারা এখন থেকে যেকোন ছলচাতুরির জন্য সতর্ক পর্যবেক্ষনে থাকবেন।

ইসলামাবাদে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের কৃতিত্বের একটি বড় অংশের দাবিদার নিউ ইয়র্ক টাইমস। যদি এটা রাষ্ট্রী বিভাগের পাকিস্তানে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে সামনা-সামনি বলা মিথ্যা গুলোর চমৎকার ব্যাখ্যা না দিত তাহলে জনসম্মুখে ঘোষনা দেওয়া সত্বেও পাকিস্তানে অনবরত অস্ত্র সরবরাহ করার পেছনের বাস্তব চিত্র কখন প্রকাশ পেত না। এর মাধ্যমে এই পত্রিকাটি মানবতার সেবায় একটি বড় কাজ করেছে কারন এর ফলে সমগ্র বাংলাদেশের মানব সভ্যতা একই সরলরেখায় এসেছে।আমরা প্রায় নিশ্চিত যে, মানবতার এমন সাহসী পর্যবেক্ষক সক্রিয় থাকলে অলক্ষিত ভাবে কাল পন্যসম্ভার হত্যাকারীদের নিকট পৌছানো সহজ হবে না।সন্দেহ ও ভয় থাকা সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় বিভাগের ঘোষনা নিঃসন্দেহে উন্নত পৃথিবীর লক্ষ্যে মানবতার যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নির্দেশ করে।আমরা সেই সকল সভা সদস্যদের অভিবাদন জানাই যারা এই চাপ সৃষ্টির জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন।