5

রণাঙ্গনে বাঙলার নারী

রণাঙ্গণে বাংলার নারী

৮ নভেম্বর, ১৯৭১

পবিত্র রমজানের কঠোর উপবাস পালন করছেন এখন দেশ রণাঙ্গন বাংলার প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষেরা। অশেষ পুণ্যের মাস এই রমজান। সাধারণভাবে একটা নির্দিষ্ট সময়ে পানাহার বিরত থাকাই রমজানের বাহ্যিক উপবাস অনুষ্ঠান। এ ছাড়া কায়মনোবাক্যে সংযম পালন করা রমজান মাসের অবশ্য করণীয় ইবাদত।

এবারের রমজান এসেছে আমাদের জাতীয় জীবনের এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী যুগসন্ধিক্ষণে। এখন আমাদের সন্তানরা দেশকে শত্রুমুক্তি করার সার্বক্ষণিক যুদ্ধে নিয়োজিত, আমাদের সর্বস্তরের জনসাধারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ তথা নিজ নিজ কর্তব্য পালন করেছেন। পবিত্র রমজানের কঠোর সিয়াম সাধনার সঙ্গে সঙ্গে এ যুদ্ধ হয়েছে আমাদের মা-বোনের ত্যাগ ও তিতিক্ষার কৃচ্ছসাধনা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাধানমন্ত্রী পবিত্র রমজান উপলক্ষে তাঁর বেতার বাণীতে বলছেন, গত বছরের রমজান মাসে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এক প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করেছে, প্রকৃতির নির্মম তাণ্ডবে সেবারে এখানে সংঘটিত হয়েছে এক ব্যাপক, ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুলসংখ্যক মানুষের আকস্মিক মৃত্যু। আর এবারের রমজানে আমরা সাত মাস আগে সূচিত এক আকস্মিক আক্রমণের বিরুদ্ধে বিরতিহীন পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করছি, যে আক্রমণ আমাদের ওপরে এসেছে এক পশু প্রকৃতির সামরিক জান্তার কাছ থেকে একান্তই অতর্কিতে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জীবনের তাগিদে আমরা সেবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছিলাম, স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনেছিলাম বানের জলে ভেসে যাওয়া ক্ষেতেখামারে, আত্মীয়স্বজনহারা ঘর-সংসারে। আর এবারের জাতীয় জীবনের তথা বাংলাদেশ ও বাঙালীর অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে আমরা আমাদের দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। একটি স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্ম-প্রতিষ্ঠার জীবনযুদ্ধই দেশ রণাঙ্গন বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী-পুরুষের জন্যে এবারের রমজান সমাসের পুণ্যময় শপথরূপে অভিষিক্ত হয়েছে।

বরকতের মাস রমজান এ মাসে আমাদের মুসলিম পরিবারে সাধারণ বাড়তি খাদ্যসামগ্রীর আয়োজন করা হয়ে থাকে। ইফতারী, সেহরী ইত্যাদির সরঞ্জাম হয়ে থাকে ব্যয়বহুল। সারাদিন উপবাস পালনের ওপর প্রচুর খাদ্য, ঘ্ৰাণযুক্ত ও সুস্বাদু খাবার স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যেই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এবারে অন্য রকম। বাংলার গৃহিনীরা এবারে সর্বময় সংযম ও কঠিন কঠোর কৃচ্ছসাধনের পক্ষপাতী। অল্পে তুষ্টির সুশিক্ষাই তারা আজ গ্রহণ করেছেনথ- গ্রহণ করেছেন জাতীয় স্বার্থের কারণেই।

আজকাল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহেস সালামের সেই সুমহান হাদিসের শিক্ষাই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য- বলা হয়েছে, এক বেলার খাবার, উপস্থিত পরিধানের জন্য এক প্রস্থ কাপড় এবং এক রাতের মতো মাথা গুজবার আশ্রয় বা ঘুমোবার বিছানা যার আছে, সে কাঙাল নয়। তার জীবনে থাকা উচিত পূর্ণ পরিতৃপ্তি। আমরা পরিতৃপ্ত। রমজানের সত্যিকার সংযম সাধনার শুভ মুহুর্তে আমাদের বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। আমাদের পরিতৃপ্তি শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ে পানাহার বিরত থাকাতেই নয়, বরং এই বরকতের মাসে ব্যয়বাহুল্য অর্জন করে। আমাদের পরিতৃপ্তি উপবাসের চেয়ে কঠোর ত্যাগ বুকের সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে। আমাদের পরিতৃপ্তি দেশকে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করার কাজে আমাদের রক্তবীজ সোনামণিদের উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়ে।

ত্রিশ দিনের আনুষ্ঠানিক উপবাস পালনের শেষে যে ঈদ- সে ঈদকে আমরা কিসের মূল্যে আনন্দমুখর করে তুলবো, সে ভাবনা থেকেও আজ বাংলার মা-বোনরা নির্লিপ্ত নন। আমরা জানি, আমরা বিশ্বাস করি, পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার পশুশক্তি যেদিন আমাদের দেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মুল হবে, সেদিনই জমে উঠবে আমাদের ঈদের উৎসব। এ জন্য যতো ত্রিশ দিনই আমাদের কেটে যাক, আমরা করে যাবো সংযম-সাধনা। একটি স্বাধীন জাতির ভবিষ্যৎ হিসাবে যেদিন আমাদের বংশধররা আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করবে, সেদিনই তো শুভ সমাপ্তি হবে আমাদের উপবাস পালনের।

এবারে আমরা দেখেছি, পুজোপার্বনে আমাদের দেশ ঢাকা-ঢোল, সানাই-কাঁসা, শঙ্খঘণ্টায় মুখরিত হয়নি। কেবল কানে শুনেছি মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দ। পূজামণ্ডপে রক্তচন্দনের লেপ দেখিনি, দেখেছি রক্ত। দুৰ্বত্ত হানাদার সৈন্যদের রক্ত। আমাদের দুঃসাহসী গেরিলা সন্তানদের হাতের অস্ত্র অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ করে চলছে এক একটি হানাদারের বক্ষদেশ। পুজোর আনন্দ আমরা উপভোগ করেছি মহিষাসুর বধের মাধ্যমে। বাংলা মাকে প্রত্যক্ষ করেছি জাগ্রত রণচন্ডীরূপে।

আমাদের সন্তানরা দেশের সর্বত্র বিস্তৃত রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। আমাদের মা-বোনরা কেউবা তাঁদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার ভূক্ষা পালন করেছেন, কেউবা গৃহবাসে যুদ্ধকালীন কর্তব্য পালন করছেন। এ কর্তব্য বড় কঠোর, ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত। ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মতোই বাংলার মাবোনরা আজ মেনে নিয়েছে জাতির এই মুক্তিযোদ্ধাকে। এ যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় তাই হয়ে উঠেছে সুনিশ্চিত।

(বেগম উম্মে কুলসুম মুসতার শফি রচিত)