সাক্ষাৎকারঃ নায়েব সুবেদার আবু তালেব শিকদার

<৯, ১০.৬, ৩০৬-৩০৭>

সশস্ত্র প্রতিরোধে ঠাকুরগাঁ– দিনাজপুর
সাক্ষাৎকারঃ নায়েব সুবেদার আবু তালেব শিকদার

১৬-৭-১৯৭৪

 

ইপিআর-এর ৯ নং শাখা ঠাকুরগাঁতে ছিল। উইং কমান্ডার ছিলেন মেজর মোহাম্মদ হোসেন (পশ্চিম পাকিস্তানী), সহকারী উইং কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম। কোয়ার্টার মাষ্টার ছিলেন ক্যাপ্টেন নজীর আহমদ (বাঙালি)।

 

২৬শে মার্চ সকালবেলা সামরিক বিধি জারী হওয়ার পর প্রায় ১০/১২ হাজার লোক ঠাকুরগাঁ ইপিআর হেডকোয়ার্টার ঘেরাও করার চেষ্টা করে। বাঙালি ইপিআররা জনসাধারণকে সেখান থেকে চলে যেতে বলাতে তারা চলে যায়। ঠাকুরগাঁ  শহরে কারফিউ জারী করা হয়। ২৭শে মার্চ একজন পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআর ঠাকুরগাঁ শহরে একজন রিকশাওয়ালাকে গুলি করে হত্যা করে। ২৮শে মার্চ একজন দোকানদারের ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

২৮শে মার্চ বিকেল ৬টার সময় আমরা গোপন সূত্রে জানতে পারলাম যে পাকিস্তানীরা আমাদের বাঙালি জেসিওদের গ্রেফতার করবে রাত ১২ ঘটিকার সময়। ২৮শে মার্চ রাত আটটায় চট্রগ্রাম বেতার থেকে আমরা খবর পেলাম পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য। রাত ৯টার সময় সমস্ত বাঙালি ইপিয়ারদের অস্ত্র জমা দেবার জন্য মেজর মোহাম্মদ হোসেন নির্দেশ দেন। আমরা রাত ১০-৩০ মিনিটে বাঙালি সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিন এবং সুবেদার হাফিজ ও অন্যান্য বাঙালি জেসিওদের নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআরকে খতম করা হয়। ওদের প্রায় ৭০/৮০ জন ছিল। বেলুচ রেজিমেন্টের একজন সুবেদার এবং কিছু সৈন্যও ছিল। এয়ার ফোর্সের কয়েকজন সৈনিক ছিল। রাত ১১টার সময় আমরা বাঙালি ইপিআর কোতে ও ম্যাগাজিন ভেঙ্গে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে নিই।

 

২৯শে মার্চ বেলা তিনটার সময় মেজর মোহাম্মদ হোসেনকে তার বাসভবনে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরিবার পরিজনসহ ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম ঐ দিন রাত্রে পালিয়ে সৈয়দপুর যাবার চেষ্টা করলে স্থানীয় জনসাধারনের হাতে সে খোচাবাড়ি এলাকাতে ধরা পড়ে। জনগণ বাঙালি ইপিআরদের কাছে তাঁকে ও তার পরিবারবর্গকে সোপর্দ করে। ঘটনাস্থলে সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

২৯শে মার্চ ঠাকুরগাঁর অধীনে সমস্ত বিওপিএ (৩৪টা) সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআরকে হত্যা করা হয়। কিছুসংখ্যক  বাঙালি ইপিআর বিওপিতে  থাকে । বাকি সবাই ঠাকুরগাঁ এসে একত্রিত হয়।

 

৩০শে মার্চ সমস্ত বাঙালি ইপিআর সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বে ভাতগাঁও পুলে প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করে। ঐদিনই দিনাজপুরের কুঠিবাড়ী থেকে  ৮ নং উইং –এর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম, সুবেদার মেজর এবং অবসর প্রাপ্ত মেজর এম টি হোসেন, ক্যাপ্টেন আরশাদ (৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্ট) ভাতগাঁও পুলের কাছে আসেন। এখানে সবাই কনফারেন্স করেন।

 

৩০শে মার্চ বিকেলে সবাই সৈয়দপুরের দিকে অগ্রসর হয়। ভূষিরবন্দর ব্রীজে আমরা ডিফেন্স তৈরী করি। ৩১শে মার্চ সৈয়দপুর থেকে বেলুচ এবং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কিছু সৈন্য আমাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ভূষিরবন্দরে প্রায় দুই ঘণ্টা ওদের সাথে আমাদের গুলি বিনিময় হয়। তারা আবার সৈয়দপুর চলে যায়। আমরা ভূষিরবন্দর থেকে একটু এগিয়ে চম্পাতলীতে ডিফেন্স তৈরী করি।

 

১লা এপ্রিল সকালবেলায় চম্পাতলীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে আমাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানীরা মিডিয়াম গান ব্যবহার করে। ১২টা পর্যন্ত আমাদেরকে ওখান থেকে হটাতে না পেরে বেলা দুইটার সময় তারা ট্যাংক নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। বিকেল ৬টা পর্যন্ত তাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ চলে। কিছুসংখ্যক বাঙালি ইপিআর সেখানে শাহাদাৎ বরণ করেন। পাকিস্তানীদের দুটো ট্যাংক আমরা ৬- পাউন্ডার গোলার সাহায্যে ধ্বংস করতে সমর্থ হই। আমরা পিছিয়ে এসে ভূষিবন্দরে ডিফেন্স তৈরী করি।

 

২রা এপ্রিল আমাদের কিছু বাঙালি ইপিআর নীলফামারী হয়ে সৈয়দপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সৈয়দপুর থেকে দুই মাইল আগে তাদের সাথে সারাদিন তুমুল যুদ্ধ চলে। রাত্রিবেলা বাঙালি ইপিয়াররা সেখান থেকে ঠাকুরগাঁ এসে একত্রিত হয়। ৩রা এপ্রিল ভূষিরবন্দরে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। সারাদিন যুদ্ধ চলে। রাতে আমরা দশ্মাইলে গিয়ে ডিফেন্স তৈরী করি।

 

৫ই এপ্রিল পাকিস্তানীদের সাঁজোয়া এবং গোলন্দাজ বাহিনী দশমাইলে আমাদের উপর অতর্কিতে হামলা চালায়। দশ মাইলে অনেক বাঙালি ইপিআর শাহাদাৎ বরণ করেন। অনেকেই আহত হন। কুঠিবাড়ীর বাঙালি ইপিআররা আবার দিনাজপুরের দিকে চলে যায়। ঠাকুরগাঁর বাঙালি ইপিআররা আবার ব্রীজে অবস্থান নেয়। 

 

৭ই এপ্রিল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ভাতগাঁর উপর হামলা চালায়। এখানেও বাঙালি ইপিআর হতাহত হয়। পেছন থেকে কোন সাহায্য না পাওয়াতে আমরা সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হই। পঁচাগড়ে গিয়ে আমরা একত্রিত হই এবং সেখানে ডিফেন্স তৈরী করি। ১৪ই এপ্রিল পঁচাগড়েও পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদের উপর আক্রমণ করে এবং আগুনে বোমার সাহায্যে পঁচাগড় শহরকে সম্পূর্ণরুপে জ্বালিয়ে দেয়। পঁচাগড় থেকে বাঙালি ইপিআররা অমরখানাতে গেয়ে শেষ ডিফেন্স তৈরী করে। সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বে প্রতিজ্ঞা নেয়া হয় যে একটা লোক জীবিত থাকা পর্যন্ত এখান থেকে কেউ পিছু হটবে না। আল্লাহর রহমতে দেশ স্বাধীন হবার পূর্ব মূহূর্তে পর্যন্ত অমরখানা আমাদের দখলে থাকে।

Scroll to Top