9

সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার খোন্দকার মতিউর রহমান

<৯, ১১.৩, ৩৩০-৩৩২>

সশস্ত্র প্রতিরোধরাজশাহীবগুড়াপাবনা
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার খোন্দকার মতিউর রহমান বীর বিক্রম
২৪-১২-১৯৭৩

২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় উইং কমান্ডার অভ্যান্তরীন নিরাপত্তা ডিউটির জন্য তিনটি প্লাটুন তৈরি করে রাখার নির্দেশ দেন। রাত আট ঘটিকার সময় উইং হাবিলদার মেজর সৈয়দুর রহমান (পাঠান) কে পুরো উইং কে ফল ইন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন তিনটি প্লাটুন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি থাকে।

 

২৬ শে মার্চ সকাল বেলায় কোয়ার্টার গার্ড কমান্ডার মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে পতাকা কোয়ার্টার গার্ডে গার্ড অব অনার দিয়ে উত্তোলন করে। ২৬শে মার্চ সকাল ৭ ঘটিকার সময় মেজর নাজমুল হক; ক্যাপ্টেন গিয়াস; মেজর আকরাম ও ক্যাপ্টেন নাবিদ আফজাল উইং এ আসেন এবং সুবেদার মেজর আবদুল লতিফ মোল্লাকে পুরো উইংফল- ইন করার নির্দেশ দেন। ফল ইন করা হয়। মেজর নাজমুল হক বললেন যে, যা করার আমি সব করব।  

 

২৬শে সকাল ৮/৯ টার সময় ১০০ থেকে ১৫০ জন লোক মাইক নিয়ে আমাদের অফিসের সম্মুখে এসে ৭ই মার্চে শেখ সাহেবের টেপ রেকর্ডকৃত ভাষণ বাজাতে শুরু করে এবং শ্লোগান দিতে থাকে। মেজর নাজমুল হক অফিসের সম্মুখে হৈ চৈ গণ্ডগোল না করার জন্য জনতাকে নির্দেশ দেন। আনুমানিক১০/১১ টার সময় কোয়ার্টার গার্ডের সেন্ট্রির উপর হঠাৎ একটি গুলি আসে। এটা শোনার পর চতুর্দিক থেকে ফাঁকা আওয়াজ শুরু হয়। ১০ মিনিট গোলাগুলি চলে। উল্লেখ্য যে ২৫ মার্চ রাতে আমরা তিনটি বাঙালি প্লাটুনকে অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত করে রাখি (ক্যাপ্টেন গিয়াসের গোপন নির্দেশে) মারাত্নক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে আশংকায়। ক্যাপ্টেন গিয়াস আমাকে এবং সুবেদার মনোয়ার আলীকে অফিসে ডেকে গোপনে বলেন যে; বাঁচার জন্য আপনারা তৈরি থাকেন ঢাকার অবস্থা খুবই খারাপ। এই কথা বলে তিনি ভেংগে পরছিলেন। গোলাগুলির পর মেজর আকরাম বেগ মেজর নাজমুল হককে অনুরোধ করেন যে সমস্ত পাকিস্তানী ইপিআরকে যেন একটি ব্যারাকে হেফাজত রাখেন। তখন সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআরকে একটি ব্যারাকে প্রহরী মোতায়ন করে রাখা হয়। তাদেরকে ব্যারাক থেকে বের হয়ে না আসতে নির্দেশ দেয়া হয়। পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআরদের পরিবারবর্গকে জেসিও মেসে রাখা হয় এবং বাংগালি ইপিআর তাদের পাহারা দেয়। মেজর নাজমুল হকের নির্দেশে তাদের অস্ত্রশস্ত্র অফিসে জমা করানো হয়। অফিসের চতুপার্শ্বে বাংগালি ইপিআর প্রহরী লাগানো হয়। বেলা বারটা- ১টার সময় বিপুল জনতা অফিসের সামনে হাজির হয়। তাঁরা ক্যাপ্টেন গিয়াস্ কে বলে যে; শান্তাহারে বিহারী অস্ত্র নিয়ে বোয়ালিয়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আপনারা এগিয়ে আসুন।  

 

২৭শে মার্চে মেজর নাজমুল হকের নির্দেশে তিনটি প্লাটুন তিনটি অয়ারলেস সেট সহ শান্তাহার অভিমুখে আমার নেতৃত্বে রওনা হয়। শান্তাহারে চারিদিকে শুধু ধোয়া আর আগুন; গোলাগুলির আওয়াজ। আমি অয়ারলেসে নওগাঁতে মেজর নাজমুল হকের সাথে যোগাযোগ করি; বাঙালি বিহারী বহু মৃতদেহ উদ্ধার করি এবং পরিস্থিতি আমাদের আয়ত্তে নিয়ে আসি। মেজর নাজমুল হক ১৪৪ ধারা জারি করেন। সীমান্তের বিওপি গুলোতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

 

৩০ শে মার্চ ক্যাপ্টেন গিয়াস ; হাবিলদার আলী আকবর (বর্তমানে নায়েক সুবেদার); এবং আমি বগুড়া অভিমুখে রওনা হই। বগুড়ার রেলওয়ের ষ্টেশন মাস্টারকে নওগাঁতে টেলিফোন এর মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করতে অনুরোধ করি। এরপর আমরা বগুড়া পুলিশ লাইনে যাই। হাবিলদার আলী আকবরকে পুলিশ লাইনে রাখা হয় ও তার সাথে ২৫ জন ইপিআর দেওয়া হয়। হাবিলদার আলী আকবরকে পুরোপুরি কমাণ্ড দেওয়া হয়। আমি ক্যাপ্টেন গিয়াস সহ নওগাঁতে ফিরে আসি।

 

৩০শে মার্চ আমি এক প্লাটুনসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বগুড়া রেলওয়ে ষ্টেশনে পৌছাই। হাবিলদার আলী আকবর ২৫ জন ইপিআর; কিছু পুলিশ; ছাত্র সহ মুজিবর রহমান মহিলা মহাবিদ্যালয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের উপর আক্রমন চালায়। মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ওদের ক্যাম্প ছিল। এক রেজিমেন্ট ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে ওরা সজ্জিত ছিল। রাত চার ঘটিকার সময় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সৈন্যরা পার্শ্ববর্তী অয়ারলেস ষ্টেশন ও এতিমখানার পার্শে পেট্রল ডাম্পে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে তারা ৩০/৩২ টা গাড়ী নিয়ে রংপুরের দিকে পালিয়ে যায়।

 

১ লা এপ্রিল বেলা ৯ টার সময় হাবিলদার আলী আকবর আড়িয়াল বাজারে এমুনিশন ডিপোর উপর আক্রমণ চালায় এবং ক্যাপ্টেন নুর আহম্মদ সহ ২৩ জন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের পরিবারবর্গকে জীবিত অবস্থায় ধরে ফেলে। তাদের পরিবারবর্গকে সে নিজের হেফাজতে রেখে হাজতে নিয়ে আসে। এই আক্রমণে তিনজন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়। ঐখানে ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন নায়েক সুবেদার আবুল কাশেমসহ এক প্লাটুন বাঙালি সৈন্য ছিল। তাদেরকে পরে ডেকে আনা হয়।

 

ঐ অ্যামুনিশন ডিপোতে ৯২ কোটি টাকার অস্ত্র শস্ত্র ছিল। ৮০ ট্রাক অস্ত্রশস্ত্র; গোলাবারুদ বগুড়াতে নিয়ে আসা হয়। এবং পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়। মেজর নাজমুল হক উক্ত সংবাদ পেয়ে বগুড়াতে আসেন এবং হাবিলদার আলী আকবরকে এই দুঃসাহসিক অভিযানের সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি আমাকে বলেন যে এত অল্প লোক নিয়ে এত বড় একটা আক্রমণ চালানো কখনো সম্ভব ছিল না।

 

বগুড়া জেলা স্কুলে আমরা ক্যাম্প স্থাপন করি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। হাবিলদার আলী আকবর ছেলেদেরকে দিবারাত্র প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। ইতিমধ্যে সকল এমসিএ; ডিসে এবং সংগ্রাম পরিষদের কর্মীগণ আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে ছিলেন পুলিশের আর-আই হাতেম আলী; তার অধঃস্থন কর্মচারীবৃন্দ ; এমসিএ ডাক্তার জাহিদুর রহমান; ডাক্তার গোলাম সরওয়ার ; এডভোকেট গাজিউল হক; এমসিএ মুজিবুর রহমান আক্কেলপুরী প্রমুখ। ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক দলের কর্মীগণ এ কাজে সহযোগিতা করেন।

 

ইতিমধ্যে মেজর নাজমুল হক কিছু লোক বাঘাবাড়ি ঘাটে পাঠাবার নির্দেশ দেন। কিছু লোক সিরাজগঞ্জে এবং কিছু লোক মহাস্থানে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে শুনতে পেলাম দিনাজপুরের ঘোরাঘাট থেকে ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আনোয়ার; ক্যাপ্টেন শওকতের চিঠি এবং একজন এমসিএ সহ হাবিলদার ও দুইজন নায়েক একটা জীপে এমুনিশন নেয়ার জন্য বগুড়াতে এসেছেন। এমসিএ গনের পরামর্শ ও মেজর নাজমুল হকের আদেশক্রমে তাদেরকে ট্রাক ও জীপে আর্মস ও গোলাবারুদ দেয়া হয়। পরে সুবেদার প্রধান পুনরায় অস্ত্র নিতে আসে। ৮ ট্রাক অস্ত্র ও দুটি ৩ ইঞ্চি মর্টার তাদেরকে দেওয়া হয়।

 

হাবিলদার আলী আকবরকে মহাস্থানে পাঠানো হয়। পরের দিন তাকে আবার ডেকে পাঠানো হয়। আলী আকবরকে হেডকোয়ার্টারে (বগুড়া) রেখে আমি বাঘাবাড়ি ঘাটে ডিফেন্সে যাই। এবং সিরাজগঞ্জের এসডিও জনাব সামসুদ্দিন; শাহজাদপুরের এমসিএ আব্দুর রহমান ; শাজাদপুরের প্রিন্সিপাল তাসাদ্দক হোসেন এবং আরো অন্যদের সহিত আমার নিজজ্ঞানে পরামর্শ করে আলী আকবরকে আনার জন্য বগুড়া পাঠাই। দুদিন পর আলী আকবর বগুড়া হতে এসে আমার সাথে বেড়াতে যোগদান করে। পাইকড়হাটে প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরী করা হয়। পরের দিন তাকে পাকবাহিনী আক্রমণ করার জন্য সাথিয়া থানায় (পাবনা) পাঠাই। ইতিমধ্যে পাকবাহিনী নগরবাড়ি থেকে (১০ই এপ্রিল) পাবনা অভিমুখে যাত্রা করে। পরদিন আলী আকবর ফেরত এসে বলল যে গতকাল (১৩ এপ্রিল) পাক সেনাবাহিনী পাবনায় প্রবেশ করেছে এবং লোকমুখে জানা গেছে তাদের এক ডিভিশন সৈন্য এডভান্স করেছে। ১৩ই এপ্রিল পাবনার ডিসি; এসপি নদী পার হয়ে কুষ্টিয়ার দিকে চলে গেছেন। পাবনা পুলিশের অস্ত্রশস্ত্র ও এমুনিশন আর-আইয়ের নিকট থেকে টিপু বিশ্বাস নিয়ে গেছে। তখন আলী আকবরকে পুনরায় নাকালীয়া বাজারে পাঠাই। নাকালীয়াতে চেয়ারম্যান (নক্সালপন্থী) তাকে সেখানে থাকতে বাধা দেয় এবং এখানে থাকতে দেবে না বলে হুমকি দেয়। পরদিন সকালে এসে আলী আকবর আমাকে এসব জানায়। ঐ এলাকার জামাতে ইসলামী ও মুসলিম লীগপন্থী কিছু লোক আমাদের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করতো।

 

আমি আলী আকবর এর সাথে পরামর্শ করি কিভাবে আক্রমণ পরিচালনা করা যায়। তারিখ ছিল ১৪ই এপ্রিল। আলী আকবরকে নির্দেশ দেই বগুড়াতে গিয়ে মেজর নাজমুল হকের সাথে পরামর্শ করে ফেরত আসতে। ১৭ই এপ্রিল আলী আকবর ফেরত আসে। এক প্লাটুন সৈন্যসহ তাকে নগরবাড়ী এবং পাবনা রাস্তার মধ্যে পাকসেনাদের যোগাযোগ বিছিন্ন করার নির্দেশ দেই। আলী আকবর ১৭ই এপ্রিল রাতে সেখানে যায়।

 

আমি জানতে পারলাম যে আমাদের যে; আমাদের সুবেদার মেজর আবদুল লতিফ মোল্লা ১৭ই এপ্রিল বাঘাবাড়ী ঘাটে এসেছেন। আমি তার সাথে দেখা করতে যাই। ২০শে এপ্রিল আমি বাঘাবাড়ী ঘাটে পৌছাই এবং দেখতে পাই হাবিলদার আলি আকবর এক আহত সৈনিককে নিয়ে ঘাটে রেখেছে। আলী আকবর বলল যে; ১৯শে এপ্রিল পাইকড়হাটে আমাদের প্রতিরক্ষাব্যূহ পাক্ সেনা অগ্রসর হচ্ছিল। সেই সময় সে পাকসেনাদের উপর গুলী ছোড়ে। পাকসেনাদের ৬ গাড়ি নষ্ট হয়েছে এবং বহু সৈন্য হতাহত হয়েছে। তার পক্ষেও অনেক হতাহত হয়েছেয়াবং ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। আহত হাবিলদার আবদুল আলীকে নিয়ে আমরা শাহজাদপুর হাসপাতালে আসি। সেখানে তার উপর অস্ত্রোপচার করা হয় স্থানীয় ডাক্তারদের দ্বারা। হাবিলদার আলী আকবর সিরাজগঞ্জের এসডিও-র সাথে যোগাযোগ করে। ছত্রভঙ্গদের আমি একত্রিত করার চেষ্টা করি কিন্তু তা পারিনি।

 

আমি তারপর ৩নং সেক্টরে যোগ দেই। সেখান থেকে আমাকে কোম্পানি কমান্ডার বানিয়ে সিলেটের আসালংবাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হয়।