6

২৬০. ১৮ নভেম্বর সম্পাদকীয়ঃ অভিযান

সমীরণ বর্মণ

<৬,২৬০,৪৪০>     

    শিরোনাম    সংবাদপত্র     তারিখ
   সম্পাদকীয়

   অভিযান

    অভিযান

 ১ম বর্ষঃ ১ম সংখ্যা

  ১৮ নভেম্বর,১৯৭১

 

[অভিযানঃ বাংলাদেশ সাপ্তাহিক সংবাদপত্র, ঢাকা। সম্পাদকঃ সিকান্দার আবু জাফর। ঢাকা নিউজপেপার প্রাইভেট লিমিটেড থেকে মুদ্রিত।]

সম্পাদকীয়               

                     অভিযান

    ফরাসী বিপ্লবের সময় এক মনীষী মন্তব্য করেছিলেন, বিপ্লবের এই সুবিশাল এবং জটিল কর্মকাণ্ড রচনা করার ফরাসী দেশের প্রতিটি মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করতে হয়েছে। প্রতিটি জাতি যখন মোহ নিদ্রা থেকে প্রাণ শক্তির প্রবল জোয়ারে জেগে ওঠে, নতুন  ইতিহাস রচনায় ব্রতী হয় তখন গোটা জাতিকে সহস্র ধারায় আপনাকে বিকাশ করতে হয় এবং প্রতিটি কর্মই তার দুঃসাহসিক অভিযান হয়ে দেখা দেয়। এই অভিযানে দুঃখ আছে, বেদনা আছে-লাঞ্ছনা, বঞ্চনা তাও আছে, কিন্তু আরো নিহিত থাকে মর্মমূলে- সূর্যলোকের মতো উজ্জ্বল-আনন্দ সৃষ্টি করার আনন্দ, মঙ্গলকর কল্যাণের কর্মে নিজকে ক্ষয় করার আনন্দ। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর স্বর্ণ-সন্ধানী সে কোদাল পেটানো শ্রমিকেরা যেমন বলে, ‘কে কোদাল চালাই, আমরা কোদাল নাচ নাচি’। একই কথা একটু ঘুরিয়ে আমাদের বাংলাদেশের মানুষেরাও বলতে পারে, আমেরা সংগ্রাম নাচ নাচছি। আমাদের এই সংগ্রাম আনন্দের সংগ্রাম। কেননা আমাদের পিত্র ভূমিতে আনন্দের বাঁচা বাঁচাবার জন্য আমরা লড়াইয়ের ডাক দিয়েছি, আমাদের মুখ বুজে থাকা ইতিহাসের শিরায় শিরায় আনন্দ শোণিত প্রবাহিত করিয়ে জীবন্ত প্রাণবন্ত এবং শৃঙ্খলিত দাসের ইতিহাসকে স্বাধীন মানুষের ইতিহাসে রুপ দেয়ার জন্য আমরা কষ্ট ভোগ করছি, আমরা মরছি।

    ভাসাভাসা ভাবে দেখলে আমাদের দুঃখ কষ্ট তার সীমা নেই। আমরা অনেক মরেছি অনেক চলে এসেছি, অনেকে ঘাতকের গুলির মুখে দেশের অভ্যন্তরে স্তব্ধ-বাক এবং অনেকে লড়েছি। আমাদের ক্ষয় ক্ষতির তুলনা নেই। রণক্ষেত্রে বলুন, শরণার্থী শিবিরে বলুন, অপরিচিত পরিবেশে প্রতিটি দৈনন্দিন কর্মই আমাদের কাছে সত্যি সত্যি অভিযান। আমরা হাসি মুখে এই অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি এবং আরো বৃহত্তর অভিযানের মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। প্রাণ ধারনের সংক্রমিত আনন্দ ধারা আমাদের পাথরের বাঁধা ভাঙতে সামনে আরো সামনে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা রক্তদা কোনো দিন বৃথা যাবে না। আমাদের দেশে একদিন বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলরাশির তলা অব্ধি রাঙিয়ে সূর্য উদিত হবে। সে দিনের আর দেরী নেই।

    নতুন ইতিহাস সৃজনের প্রখর আনন্দে আমাদের জাতি অসম্ভবকে সম্ভব করার অভিযানে নেমেছে। আমরা জাতির অগ্রযাত্রার স্পন্দন ধারণ করতে চাই, জাতির আনন্দ ধারার বাহন হতে চাই। আমরা নিজেদেরকে জাতির সর্বাঙ্গীণ সংগ্রামের সহযাত্রী বলে ঘোষণা করেছি। শুধু আজ নয়, শুধু কাল নয়, সুদূর ভবিষ্যতেও আমরা বাংলাদেশে তথা বিশ্ব মানবের অধিকার আদায়ের অভিযানে শিকার বাজ পাখির মতো চক্ষু তীক্ষ্ণ এবং দৃষ্টি সজাগ রাখবো। স্বাধীন মানুষের চিন্তা, কর্ম, জীবিকা এবং কল্পনায় শৃঙ্খল পরাবার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে চলবে অভিযান- এ আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।