6

২৭৯. ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব আজ আমাদের হাতে

কম্পাইলারঃ জেসিকা গুলশান তোড়া

<৬,২৭৯,৪৭৮-৪৭৯>

সংবাদপত্রঃ অভিযান ১ম বর্ষঃ ৪র্থ সংখ্যা

তারিখঃ ১৭ ডিসেম্বর,১৯৭১

 

বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব আজ আমাদের হাতে

(অভিযান রাজনৈতিক পর্যালোচক)

 

অবশেষে যা হবার তাই হলো। সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর চোখের জল আর রক্ত স্নানের সমাপ্তি ঘটলো। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল একটি নতুন রাষ্ট্র- স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

 

এই স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদীদের নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকে তেমনি পঞ্চান্ন কোটি ভারতবাসীর আত্মার সাথে সংযুক্ত করেছে বাংলাদেশের জনগণকে।

 

মহান ভারত এবং ভুটান এই নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি জানিয়ে বিশ্বের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অনেক দেশই এখনো স্বীকৃতি জানায়নি।

 

কিন্তু তাতে ক্ষোভ করার কিছু নেই। কারণ আমাদের প্রচুর সম্পদ না থাকতে পারে, না থাকতে পারে প্রভাব কিংবা প্রতিপত্তি কিন্তু বাংলার আপামর জনতার দৃঢ়মনোবল আমাদের রয়েছে। জনগণতান্ত্রিক চীনকেও অনেক দিন পর্যন্ত বিশ্বে বিভিন্ন রাষ্ট্র মেনে নেয়নি। কিন্তু তা বলে তাঁর প্রগতি কিংবা সমৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যায়নি। সাত কোটি চীনা জনগণ নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভর করে জনগণতান্ত্রিক চীনকে তার যোগ্য আসনে আজ প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

ধর্ষিতা, লুন্ঠিতা বাংলাকে নবসাজে সজ্জিত করার দায়িত্ব আজ আমাদের হাতে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ কথাটার সঠিক মর্যাদা দেবার দিন আজ উপস্থিত।

 

নবজাত রাষ্ট্রকে নতুন ছাঁচে গড়ে তোলার আগে কতকগুলো বাস্তব সত্যকে আজ উপলব্ধি করতে হবে, যে উপলব্ধি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তোলার পথে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

 

আমরা যেন ভুলে না যাই যে ২৫শে মার্চ যখন পাক জঙ্গীচক্রের বর্বর পশুরা আমাদের উপর নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো তখন অজ পাড়াগাঁয়ের খেতের কিষাণ, যারা রাজনীতির মারপ্যাচ থেকে সব সময় নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতো, লড়াই এর ময়দানে তারাই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে। রোজকার মতো কারখানার ভোঁ সেদিনও বেজেছিল, কিন্তু খেটে খাওয়া মজুর তার আগেই শুনতে পেয়েছিল বাংলা মায়ের করুণ আর্তনাদ। মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে সে শরীক হয়েছিল শত্রুহননের মিছিলে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত ছাত্র শিক্ষক সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকে সঠিক নেতৃত্ব এগিয়ে এসেছিলেন মুক্তি মিছিলে।

 

আমাদের সুদীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাস। আমরা মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষায় সংগ্রাম করেছি, নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবীতে। প্রত্যেকটি সংগ্রাম আমাদের সামনে নতুন নতুন শিক্ষা নিয়ে হাজির হয়েছে। আমরা আরও জেনেছি সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশবাদের চোয়াল থেকে মুক্ত হতে না পারলে একটা জাতির সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। বাঙ্গালীর আত্মার সাথে যাদের নাড়ীর যোগ সেই সব মহাজ্ঞানী মহাজনদের অত্যন্ত কাছাকাছি যেতে আমরা তখনই সক্ষম হয়েছি যখন আমাদের কৃষ্টির উপর আঘাত এসেছে, সংস্কৃতির উপর আঘাত এসেছে। এই কথাগুলো বলার পেছনে একটি মাত্রই উদ্দেশ্য সেটি হলো আমরা আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছি সত্যি, কিন্তু আমাদের আরো অনেক অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তার যোগ্য আসনে।

 

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমেদ সম্প্রতি এক বেতার ভাষণে বলেছেন যে অপরাধীকে শাস্তি দেবার ক্ষমতা একমাত্র সরকারেরই রয়েছে। আজ যদি কেউ ধর্ম কিংবা বর্ণের মাপকাঠিতে লাঞ্চিত হন তাহলে সেটা হবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতি চরম অবমাননা। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। নির্বাচনের প্রাক্কালে ঢাকার একটি জনসভায় তিনি বলেছিলেন যে যারাই বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন তাদেরকেই বাংলাদেশের জনগণ বলে পরিগণিত করা হবে।

 

এই কথা আমাদের অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আজ যদি বাঙ্গালী বিহারী প্রশ্ন ওঠে কিংবা সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হয় তাহলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধিই বিঘ্নিত হবে, বিগত গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো থেকে আমরা যে শিক্ষা নিয়েছিলাম তার কোন মূল্যই থাকবে না। আমরা যে অনেকদূর এগিয়েছি সেটাও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।

 

ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতির মধ্য দিয়ে বিশ্বের কাছে আমাদের এটাই প্রমাণ করতে হবে যে গোটা বাঙ্গালী জাতি সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে পচা আবর্জনার মতো ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

সাম্প্রদায়িকতার কবর রচনা করেই আমাদের ক্ষান্ত হলে চলবে না। আমাদের এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে, আমরা সংগ্রাম করেছি সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে। পশ্চিম পাকিস্তানে জঙ্গীচক্র মার্কিন সমর্থনপুষ্ট হয়ে আমাদের উপর যে শোষণ চালিয়েছে তাতে সবচেয়ে বেশী নিগৃহীত হয়েছে বাংলার কৃষক সমাজ। মৌলিক গণতন্ত্র চালু করে গ্রামে গ্রামে নিজেদের দালাল তৈরী করা হয়েছিল। এই দালালরাই ছিল সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশবাদী শোষকদের আশা ভরসা। সরকারী সুযোগ সুবিধা গুলো ছিল একমাত্র দালালদেরই প্রাপ্য। আর এই সুযোগে গ্রামের ধনী কৃষক হয়েছে মাঝারি কৃষক, মাঝারি কৃষক হয়েছে গরীব কৃষক আর গরীব কৃষক হয়েছে ভূমিহীন। গ্রামের সমস্ত সম্পদ জমা হয়েছে গুটিকয়েক লোকের হাতে।

 

এই সত্যগুলো সামনে রেখে আমরা যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্লেষণ করি তাহলে যে সত্য আমাদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় সেটি হলো এই গুটিকয়েক লোকের কঠোর বিরোধিতা। অন্যদিকে সাধারণ কৃষক স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে জড়ো হয়েছিল মুক্তির মিছিলে।

 

সুতরাং এইসব দালালদের উপড়ে ফেলবার সময় এসেছে। উপড়ে ফেলতে বলছি এই কারণে যে কতকগুলো আগাছা যেমন সমস্ত জমিটাই নষ্ট করে দেয় তেমনি এই গুটিকয়েক আগাছা সমস্ত দেশকে ধ্বগসের পথেই নিয়ে যায়। কৃষক তাই প্রথমেই জমি থেকে আগাছা উপড়ে ফেলে দিয়ে জমিকে ফসলে ভরপুর করে তোলে। আমাদেরকেও তেমনি এইসব দালালদের নিশ্চিহ্ন করে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হবে। শুধু নিশ্চিহ্ন করলেই হবেনা, সাথে সাথে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে আর যেন এই সব দালালদের সৃষ্টি না হয়।

 

এই দুটো মৌলিক প্রশ্নকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করেই আমাদের এগোতে হবে। এই উপলব্ধির উপর ভর করেই নির্ধারণ করতে হবে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। যার বাস্তব প্রয়োজন জন্ম দিবে এক সুখী সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বপরিসরে প্রতিষ্ঠিত হবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।