apd9

Razibul Bari Palash

সেদিন জমিদারের মত সবাইকে আমি ‘ডাক্তার’ ঘোষণা দিয়ে দিলাম। শীতের রাত। ইমার্জেন্সিতে আমার জীবনের প্রথম ডিউটি। আমি একাই আছি। এসিডিটির জন্য বুকে ব্যাথা আর নানা কারণে তলপেটে ব্যাথা ছাড়া এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাতে তেমন কোন রোগী আসেনা। হঠাত একটি ভ্যানে তিনজন সড়ক দুর্ঘটনার রোগী আসল। একজনের দুইপায়ের হাঁটুর একটু উপর থেকে নিচের অংশ পুরো ছিন্ন হয়ে গেছে। তবু সে সজাগ। ব্যাথা নেই। (চরম দুর্যোগে মস্তিষ্ক কোন ব্যাথার সেনসেশন দেয় না।) ছেলেটি সুদর্শন। একটি টি-শার্ট পরা। তাতে লেখা ‘Be careful – it looks like human.’ একহাতে ব্রেসলেট – অন্য হাতে ঘড়ি। শান্ত কণ্ঠে সে বলল – ‘আরও আসছে।’ এই রোগীটি ম্যানেজ করতে পৃথিবীর সর্বোচ্চ হাসপাতাল হিমসিম খাবে। আমি কী করব বুঝে ওঠার আগে একে একে মোট ৪৬ জন আহত যাত্রী এসে গেল। প্রচুর সাধারণ জনতাও আসলো। আজ সবাইকে দ্রুততম সময়ে ডাক্তার বানানোর পালা। আলমারি থেকে ব্যান্ডেজ বের করে বললাম যেসব রোগীর রক্ত বের হচ্ছে সেখানে আগে ব্যান্ডেজ বাঁধুন। আর ব্যাথার ইনজেকশন বের করে বললাম যারা ব্যাথার কথা বলবে তাদের মাংসে এগুলো পুশ করুন। আশ্চর্য ব্যাপার হল কেউ কোন প্রশ্ন না করে যেভাবে খুশি – এমন কি জামার উপর দিয়েই – হাতে ইনজেকশন পুশ করছে। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করলো না – ‘ভাই, আপনি কি ডাক্তার?’!! ২৩ জনকে অন্যত্র রেফার করেছিলাম। তাদের ১ জন মারা গেছে। সেই ছেলেটি। সময়ের প্রয়োজনে সেদিন আমরা সবাই ছিলাম ডাক্তারের ভূমিকায়।

বাঙালিকে যদি আরও হাজার বছর পরে জিজ্ঞেস করা হয় তাদের সর্বোচ্চ অর্জন কী? উত্তর আসবে একটিই – মহান স্বাধীনতা। জহির রায়হান বলেছিলেন সময়ের প্রয়োজনেই হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। ঠিক তেমনি আজ সময়ের প্রয়োজনেই এই দলিলের কাজ করা। একটি দলের সম্মোহিত বৈদ্যুতিক স্পর্শে। কোন অভিজ্ঞতা নেই – অনেকটা সেদিনের ইমার্জেন্সিতে হঠাৎ ‘ডাক্তার’ হয়ে ওঠা সাধারণ জনগণের মত। যে পাঠক এই লেখা পড়বেন তা-ও সময়ের প্রয়োজনে।

যুদ্ধের সময় যে নিখোঁজ লাশগুলো হাড় পর্যন্ত চেটে-পুটে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে শেয়াল-কুকুর-শকুনরা, হাজারো গণকবরে সৎকারবিহীন যারা পড়ে আছেন, ক্রমাগত ধর্ষণে যাদের চোখ মরা লাশের মত নিথর হয়েছিল, চরম লজ্জায় যে নারী বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যার পথ, যে মা ভাত রেঁধে আমৃত্যু অপেক্ষা করেছেন তাঁর ছেলের ফিরে আসার জন্য, যেসব পঙ্গু বীর মুক্তিযোদ্ধা তিলে তিলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, বিজয়ের দিনে যার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে – আমি জানি তাদের কাছে ক্ষমা চাইবার কোন অধিকার আমার নেই।

তবু বিশ্বাস করি দুর্ভাগা বাংলায় বার বার তাঁরা ফিরে আসে – কখনো জীবনানন্দের শঙ্খচীল হয়ে – অথবা অলস দুপুরে ধানখেতের উপর বয়ে যাওয়া গরম বাতাসের ঢেউ হয়ে – ঘুমন্ত শিশুর কপালের কাজল-ফোঁটা হয়ে – নতুন বউয়ের পায়ের আলতা হয়ে – পরিশ্রান্ত সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের হাতের তালপাখা হয়ে- স্কুলগামী ছোট্ট শিশুর পকেটের লাটিম হয়ে – নবান্নের সেদ্ধ ধানের গন্ধে – বেকার যুবকের অবাধ ধৈর্য হয়ে – কালবৈশাখী ঝড়ের আগমুহূর্তে গরু নিয়ে গোয়ালে ফিরতে পারা কিশোরীর হৃদকম্পে – অন্ধকার রাতে বিলের ভেতর নিঃশব্দ জেলেনৌকায় টিমটিম করে জ্বলা হারিকেনের আলোতে। তাঁরা আসে। আসবে।

-ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী (পলাশ)
শিক্ষক। গবেষক (টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়)