2

ঢাকায় জনসভায় ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান শেখ মুজিবুরের

<2.168.674-677>

                                               সৈন্য অপসারণ করে ক্ষমতা  হস্তান্তর করুন

                                               ঢাকার এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান

                                                                  মার্চ ৩,১৯৭১

 

 

ঢাকা, ৩রা মার্চ :  আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান  শহর থেকে সৈন্যবাহিনী অপসারণ করে  নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্ত করার এক অহবান করেছেন কর্তৃপক্ষের নিকট।

 

আজ বিকেলে পল্টনের এক জনসভায় আওয়ামীলীগ সভাপতি বলেন, কর্তৃপক্ষকে  বুঝতে হবে  জনগন নিজেদের শাষণ চায় এবং জোর করে তাদের দমন করতে চাইলে তারা তাদের নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধা করবে না।

 

যে পর্যন্ত না জনগনের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হচ্ছে সে পর্যন্ত  সবাইকে সকল ধরনের ট্যাক্স বন্ধ করে দেবারও নির্দেশ দেন তিনি।

 

আওয়ামীলীগ সভাপতি কর্তৃক  ডাকা সারা প্রদেশব্যাপী হরতালের অংশ হিসেবে  ছাত্রলীগ আজ এই জনসভার আয়োজন করে।

 

“সাংবিধানিক পদ্ধতিতে বাঁধা দান করে কর্তৃপক্ষ ফলত জনগণকে বাধ্য করছে নিজেদের আইনগত অধিকার আদায়ের জন্য বুকের রক্ত ঝড়াতে। যেটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সংশ্লীষ্ট কর্তিঋপক্ষকে তাই আহবান জানাই অবিলম্বে সামরিক শাষণ পরিহার করে এবং জনগনের প্রনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে এই ভুল পথ থেকে সরে আসুন”।

 

সভার সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকি। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন, জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জ্বনাব আবুল মান্নান, ছাত্রলীগের সাধারণ সপমাদক জ্বনাব শাজাহান সিরাজ এবং ডাকসু সাধারণ সম্পাদক জ্বনাব আব্দুল কুদ্দুস মাখন।

 

আবেগঘণ ত্রিশ মিনিটের বক্তৃতায় শেখ মুজিব সবাইকে শান্তিপূর্ন এবং সংগঠিতভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।

সম্পর্কে সজাগ থেকে সম্পূর্ন শান্তি এবং নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুরোধ জানান তিনি, অন্যথায় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হবার সম্ভাবনা থেকে যায়।

 

হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষে  একে অন্যের জানমাল রক্ষায় দেশের সকল স্তরের জনগনকে সজাগ থাকা এবং আন্দোলনে সামিল  আহবান জানান তিনি।

 

কর্তৃপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন তিনি এবং বাংলাদেশের জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ে জীবন দিতে প্রস্তুত আছে, তিনি সুস্পষ্ট বলে দেন জনগন যে কোন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছেন।

 

প্রয়োজনে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হলেও জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি কখনোই বেঈমানী করবেন না।

 

আওয়ামীলীগ প্রধান বলেন যারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে  ক্ষমতার হস্তান্তর চেয়েছেন, কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে।

 

আগামী ৭ তারিখ পর্যন্ত কর্মসূচী ঘোষণ করে, আন্দোলনের সফলতার জন্য তিনি সকল স্তর থেকে সাহায্য এবং সহযোগীতা চেয়েছেন।

 

তিনি বলেন প্রতিদিন সকাল ৬ টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে হরতাল চলবে। হরতালের পর যানবাহন চলাচল করবে।  হরতালের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য রিকশাওয়ালাদের কিছু টাকা  ভাড়া বাড়িয়ে দিতে সকলের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

 

রবিবার দুপুর ২টায় রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায় বক্তৃতা রাখবেন তিনি।  সকল সরকারী অফিস, সচিবালয়,হাই-কোর্ট। অন্যান্য আদালত, আধা সরকারী এবং স্বায়ত্বশাষিত প্রতিষ্ঠান, পিআইএ, রেলওয়ে এবং অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম, যানবাহন, মিল, ফ্যাক্টরী, বাজার এবং সব শিল্প কারখানা  হরতালের আওতাধীন থাকবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।

 

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে রাখা হয়েছে দেশ রক্ষার জন্য, এবং জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে তাদের ব্যবহার করা যাবে না। সেনাবাহিনীকে অনতিবিলম্বে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানান শেখ সাহেব।

 

গতকাল রাতে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনায় শোক জানানোর ভাষা তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।

 

দেশের বর্তমান অবস্থা তার এবং বাংলাদেশের জনগণের সৃষ্ট নয় বরং শান্তিপূর্ন উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে সেইসব ষড়যন্ত্রকারীদেরই সৃষ্টি বলে স্পষ্ট করেন তিনি। এমনকি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচিত দলকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

 

শেখ সাহেব দেশের সবাইকে শান্তিপূর্ন এবং সুশৃঙ্খলভাবে পরিকল্পিত সূচী অনুযায়ী হরতাল পালনের নির্দেশ দেন।

 

এ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল, সংবাদ মাধ্যম, ওষুধের দোকান, পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হরতালের আওতার বাইরে থাকবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, আজকের এই বক্তৃতাই তাঁর ‘শেষ বক্তৃতা’ হতে পারে । তিনি যদি উপস্থিত থাকতে নাও পারেন তারপরও সবাইকে সমান তালে আন্দোলন চালিয়ে যাবার হুকুম দেন তিনি। তিনি বলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দেবার মত এবং কোন সমস্যা ছাড়া আন্দোলন চালিয়ে নেবার মত নেতা তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছে।

 

পূর্ব নির্ধারিত সূচী অনুযায়ী বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দেবার কথা থাকলেও সভা শেষে তা বাতিল করা হয়। পরিবর্তে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে সকল শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাতের/প্রার্থনার নেতৃত্ব দেন তিনি।

 

সভায় উপস্থিত অন্যান্যরা জনগণকে সকলের মধ্যে শান্তি এবং সহাবস্থান বজায় রাখা এবং লুট এবং অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আহবান জানান।

 

সমবেত কন্ঠে সকলে ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশের জনগনকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না এবং যে কোন উপায়ে তাদের লক্ষ্যে পৌছতে সবাই বদ্ধপরিকর।

 

সভায় গত দুই দিনে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শোক প্রস্তাব আনা হয় এবং নিহতদের আত্নার শান্তি কামনা করা হয়। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারা গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

 

সভার আরেকটি সিদ্ধান্তে দেশের সকল স্তরের জনগনকে স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনে শেখ মুজিবের গতিশীল নেতৃত্বে সামিল হবার জন্য আহবান জানানো হয়।

 

সভায় একটি শোষনবিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শপথ গ্রহণ করা হয় যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবে। 

 

স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শেখ মুজিব “শান্তিপূর্ণ সত্যগ্রহ” আন্দোলনের ডাক দেন এবং আন্দোলনের সফলতার জন্য সবাইকে শান্তিপূর্ন অবস্থা বজায় রাখার আহবান জানান।

 

তিনি সবাইকে যে কোন মূল্যে লুটতরাজ এবং রাহজানীর বিরুদ্ধে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন।  যেকোন ধরনের শান্তিবিঘ্নত কর্মকান্ডের বন্ধের নির্দেশ দেন তিনি, কারন শক্ত নিয়মানুবর্তিতা ছাড়া বড় কোন আন্দোলন সফলতা পেতে পারে না।

 

জাতিগত সম্প্রীতি বজায়ের আহবান জানিয়ে শেখ মুজিব আরও বলেন বিহারী এবং অমুসলিমরা “আমাদের পবিত্র বিশ্বাস”

 

গত ২৩ বছরে  এবং গতকালের হরতালে বাঙ্গালী আত্নদানের কথা স্মরণ করেন তিনি।

 

‘গতকাল কতজন মারা গিয়েছে আমি জানিনা’ তিনি আরও বলেন, মেশিনগানের গুলির শব্দ তিনি নিজে শুনেছেন। নিহতদের স্মরণে এক প্রার্থনা/মোনাজাত করা হয় তাঁর নেতৃত্বে।  গতকালের নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের মৃতদেহ আনা হয়েছিল সভাটিতে।

 

মুজিব বলেন, তিনি চেয়েছিলেন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ করতে,তিনি আরও বলেন যদি মার্চের ৭ তারিখের মধ্যে সরকারের কর্মকান্ড অপরিবর্তিত থাকে তাহলে তিনি তার পরিকল্পনা বলবেন রেসকোর্স ময়দানে। যেখানে একটি জনসভার কথা রয়েছে। তিনি বলেন যদি কোন অভাবিত কারনে তিনি নাও থাকতে পারেন, তাহলে অন্য কেউ এই দায়িত্ব পালন করবেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যক্ত করবেন।

 

তিনি বলেন যে কোন গণ আন্দোলনের স্বার্থকতার পূর্ব শর্ত হচ্ছে সঠিক নিয়ম-শৃঙ্খলা। কত প্রাণ গেল সেটাও গৌণ হয়ে যায় যদি সঠিক নিয়ম শৃঙ্খলা না থাকে। সুনির্দিষ্টভাবে স্বেচ্ছাসেবকদের ই বিষয়ে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের তাগিদ দেন তিনি।

শেখ মুজিব বলেন রাস্ট্রের বর্তমান অবস্থার জন্য আমরা দায়ী না।  তিনি বলেন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ত ১৫ ই ফেব্রুয়ারী তারিখের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলীর পক্ষে ছিলেন তারা। কিন্তু ভুট্ট সাহেবের বিরোধিতায় এটা পিছিয়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেয়া হয়। এবং এটা যখন আজকে হওয়ার কথা ছিল ভুট্টো আবারও তাতে বিরোধীতা করে।

 

আওয়ামীলীগ প্রধাণ  ন্যাশনাল আজকে শুরু হতে যাওয়া ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রশ্নে পিপল’স পার্টি প্রধানের এমন অবস্থানের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি যোগ করেন যদিও তারা অ্যাসেম্বলীতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন তবুও বন্দুকের নল তাদের দিকেই তাক করে রাখা হয়েছে।  পশ্চিম পাকিস্তানে আগুন জ্বলবে ভুট্টোর এমন হুমকীর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

 

এক প্রসঙ্গে শেখ মুজিব বলেন ‘আপনারা যদি আপনাদের সংবিধাণ গঠণ করতে না চান তাহলে আমাদেরকে আমাদের নিজেদেরটা করতে দিন এবং আপনারা আপনাদের নিজেদেরটা করুন এবং তারপর দেখা যাবে যে আমরা ভাতৃত্ববোধ নিয়ে থাকতে পারি কিনা।

 

আওয়ামীলীগ প্রধাণ বলেন বাংগালি বুকের রক্ত এবং প্রাণের বিনিময়ে তাঁকে জেল থেকে মুক্ত করেছে, আমরা আরও ত্যাগ এবং প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত আছি। তিনি আরও বলে সাত কোটি বাংগালিকে হত্যার ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবে না।

 

শেখ মুজিব বলেন তিনি যদি মারাও যান তাঁর আত্না বাংগালীর মুক্তি এবং দুবেলা দুমুঠো খাবার পাচ্ছে দেখে খুশী হবেন।

 

শেখ মুজিব বলেন পশ্চিম পাকিস্তানের গরীব জনগনের প্রতি তাদের কোন বিদ্বেষ নাই। তারা গত ২৩ বছর ধরে একসাথে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু পশ্চিমা সরকার এখন অপসৃত হতে চাইছে কারন তারা ভাল করেই জানে যে তারা এই শোষণ চালিয়ে যেতে পারবে না।

 

সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকলে তা পালন না করার আহবান জানান তিনি। যদি তারা সেটা না পারেন তাহলে তাদের অফিস করা থেকে বিরত থাকার আহবান জানান তিনি। তিনি বলেন এটা জাতীয় আন্দোলন এবং এখানে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ জরুরী।